ইউসুফ (আ.)-কে নীল নদে দাফন করা হয়েছিলো যে কারণে

ইউসুফ (আ.)-কে নীল নদে দাফন করা হয়েছিলো যে কারণে

ধর্ম ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৫৬ ৪ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ১৫:১৩ ৪ এপ্রিল ২০২০

মিশরের প্রতিটি মানুষ, বাচ্চা থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই ইউসুফ (আ.)-কে আল্লাহ তায়ালার রহমত মনে করতেন।

মিশরের প্রতিটি মানুষ, বাচ্চা থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই ইউসুফ (আ.)-কে আল্লাহ তায়ালার রহমত মনে করতেন।

আমরা হয়তো অনেকেই জানি যে আল্লাহর নবী ইউসুফ (আ.)-কে নীল নদে দাফন করা হয়েছিল। তারপরে এটি উদ্ধার করেছিলেন আল্লাহর আরেক নবী মূসা (আ.)। মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, কেনইবা ইউসুফ (আ.)-কে নীল নদে দাফন করা হয়েছিল এবং এর পেছনে কি কারণ ছিল? 

চলুন তবে জেনে নেয়া যাক; হজরত ইউসুফ (আ.)-কে নীল নদে দাফন করা হয়েছিলো যে কারণে-

হজরত ইউসুফ (আ.)-কে যখন আল্লাহ তায়ালা মিশরের প্রিয় বানালেন, তখন মিশরের সবাই তাকে ভালোবাসতেন, তার রূপ ও গুণের জন্য। এমনকি মিশরের বাদশাহও তাকে জিজ্ঞাসা না করে কোনো কাজ করতেন না। একবার সে এলাকায় দুর্ভিক্ষ হয়, যার কারণে কোথাও খাদ্যশস্য ছিলো না। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা ইউসুফ (আ.) এর জন্য মিশরকে এই ভয়াবহ ঘটনা থেকে বাঁচিয়ে রাখেন। মানুষ দূর দূর থেকে এসে খাদ্যশস্য কিনে নিয়ে যেত। 

একদিন ইউসুফ (আ.) এর ভাই যিনি ইউসুফ (আ.)-কে কুয়োতে ফেলে দিয়েছিল, তিনিও মিশর চলে আসে। ইউসুফ (আ.) যখন এই বিষয়ে জানতে পারেন যে, তার ভাই এখানে এসেছে তখন তিনি তার পরিবারকে মিশরে নিয়ে আসার চিন্তা করেন। তিনি তার ভাইদের বললেন, এই পাঞ্জাবি আমার বাবার চোখের ওপর রাখবে তাহলে তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন। তারপর বাবা ও মাকে মিশরে নিয়ে এসো।

ইউসুফ (আ.) এর পিতা হজরত ইয়াকুব (আ.) যখন এই কথা জানতে পারেন। তখন তিনি পুত্রের ভালোবাসায় মিশরে চলে আসেন। অন্যদিকে ইউসুফ (আ.) মিশরের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ ছিল। তাই রাজা প্রজা সবাই তাদের স্বাগতম জানানোর জন্য সৈন্য সামন্ত নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কারণ ইউসুফ (আ.) এর বাবা-মা বলে কথা। ইউসুফ (আ.) এর বাবা তার ছেলেকে দূর থেকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন এই সৈন্য বাহিনী কার? তার ছেলেরা উত্তর দিলেন এই সৈন্য দল আপনার ছেলে। 

তখন নবী ইয়াকুব (আ.) আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে থাকলেন। এরপর হজরত জিবরাইল (আ.) নাজিল হয়ে বললেন, হে আল্লাহর নবী! ইয়াকুব দেখো আল্লাহ তোমার ছেলেকে কতটা সম্মান দিয়েছেন। আর আজ পিতা পুত্রের মিলন দেখে আকাশের ফেরেশতা জমিনে চলে এসেছে। তখন ইয়াকুব (আ.) ও ইউসুফ (আ.) মিলে সবার সামনে কান্না করতে লাগলেন। কারণ চল্লিশ বছর পর তাদের সাক্ষাৎ হয়। তারপরই ইউসুফ (আ.) পিতাকে জাকজমকভাবে তার আসনে বসালেন। তার ঈমান ও মর্যাদা দেখে মিশরের বাদশাহ নিজের মাথার মুকুট নবী ইউসুফের (আ.) পায়ের কাছে রেখে আল্লাহর দ্বীনকে কবুল করলেন। এবং ইউসুফ (আ.) ও তার পিতাকে আল্লাহর নবী বলে স্বীকার করলেন।

আর বনি ইসরাইলরা মিশরের অধিবাসীদের সঙ্গে থাকতে শুরু করলেন। ইউসুফ (আ.) এই সময় একটা শহর বিস্তার করলেন। যার নাম তিনি কৌশান রাখলেন। সময় চলে যাচ্ছে, এই ঘটনার প্রায় চব্বিশ বছর পর ইউসুফ (আ.) এর পিতা ইয়াকুব (আ.) যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন তার শেষ ইচ্ছা ছিল যেন তাকে তার বাবার পাশে কবর দেয়া হয়। তিনি মারা যাওয়ার পর ইউসুফ (আ.) তার বাবার ইচ্ছামতো, হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবং হজরত ইসহাক (আ.) এর পাশে দাফন করেন এবং ফিরে এসে মিশরের শাসন বার চালানো শুরু করেন। 

মিশরের প্রতিটি মানুষ, বাচ্চা থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই ইউসুফ (আ.)-কে আল্লাহ তায়ালার রহমত মনে করতেন। যখন ইউসুফ (আ.) মারা যান, তখন সবাই চাইছিলেন তার কবর মোবারক যেন তাদের মহল্লায় বানানো হয়। যাতে তাদের উপর আল্লাহর তরফ থেকে রহমত এবং বরকত বর্ষিত হয়। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো যে, ইউসুফ (আ.) এর দেহকে কফিনে ভরে নীল নদে দাফন করা হবে। যাতে নীল নদের পানি তার দেহ মোবারক ছুঁয়ে সে পানি সমস্ত ঘরে ঘরে পৌঁছায়। যেন সবার উপরে তার জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে রহমত বর্ষিত হয়। তারপর ইউসুফ(আ.) এর দেহ মোবারক সেই অনুযায়ী নীল নদে দাফন করা হলো।

হজরত ইউসুফ (আ.) মৃত্যুর আগে বলেছিলেন যে, আমি হজরত জিবরাইল (আ.) এর কাছ থেকে শুনেছি যে, এমন এক সময় আসবে যখন আমার পরিবার এখান থেকে হিজরত করে অন্য জায়গায় চলে যাবে। তখন তোমরা আমার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী আমার কবরকে সঙ্গে নিয়ে যাবে এবং আমার বাবা, দাদা এবং বড় দাদার পাশে দাফন করে দিও। এভাবেই দিন কাটতে লাগলো এবং সময় বদলাতে লাগলো।

এরপর মিশরের নতুন বাদশাহ বনি ইসরাইলের ওপর অমানবিক নির্যাতন শুরু করলো। তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সেই অত্যাচার শেষ করার জন্য কয়েক শত বছর পর তার নবী মুসা (আ.)-কে প্রেরণ করলেন। মুসা (আ.) যখন ফেরাউনের শাসন ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয় এবং মিশর থেকে তার সম্প্রদায়কে নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন, তখন জিবরাইল (আ.) নাজিল হলেন এবং বললেন, আল্লাহ তায়ালার আদেশ ইউসুফ (আ.) এর ইচ্ছা পূরণ করো। ইউসুফ (আ.) মারা যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিলেন যে, আমার সম্প্রদায় যখন এখান থেকে হিজরত করবে তখন যেন আমার দেহ সঙ্গে করে নিয়ে আমার বাপ, দাদার কবরের পাশে দাফন করা হয়। তখন মুসা (আ.) তার সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করলেন যে, কে এমন আছে যিনি জানেন যে, ইউসুফ (আ.) এর কবর কোথায় দাফন করা রয়েছে? তখন এক বৃদ্ধা নারী বললেন, আমি জানি ইউসুফ (আ.) এর কবর কোথায় রয়েছে। তারপর সেই বৃদ্ধা মুসা (আ.)- কে নীল নদের তীরে নিয়ে গেলেন। এবং তখনই ইউসুফ (আ.) এর কফিনে ভরা দেহ নীল নদ থেকে বের করে তাদের সঙ্গে ফিলিস্তিনি নিয়ে পৌঁছে গেলেন। প্রায় চারশত বছর পর হজরত ইউসুফ (আ.) ইচ্ছা পূরণ হয় তাকে তার বাবা, দাদা ও বড়দাদার পাশেই দাফন করা হয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে