আয়ু ও রিজিক বৃদ্ধিতে আত্নীয়তার বন্ধন অটুট রাখুন 

আয়ু ও রিজিক বৃদ্ধিতে আত্নীয়তার বন্ধন অটুট রাখুন 

আতিকুর রহমান নগরী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:৫৮ ৯ জুলাই ২০২০  

বুখারি শরিফের বর্ণনায় হজরত আনাস (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, কেউ যদি চায় যে তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং মৃত্যুর পরও তার সুখ্যাতী স্থায়ী হোক, তবে সে যেন  তার আত্নীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে।

বুখারি শরিফের বর্ণনায় হজরত আনাস (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, কেউ যদি চায় যে তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং মৃত্যুর পরও তার সুখ্যাতী স্থায়ী হোক, তবে সে যেন  তার আত্নীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে।

নেক হায়াত আর বরকতময় রিজিক যে মহান আল্লার তরফ থেকে আমাদের জন্য কতো বড় নেয়ামত তা আমরা একেবারে ভুলে গিয়ে আত্নীয়-স্বজন, পরিজনের আগমনকে কালো চশমায় দেখি। মনের ভেতর শয়তান ওসওসা দেয় সম্পদ কমে যাবার। স্টোর রুমে সংরক্ষিত সাপ্তাহিক কিংবা মাসিক বাজারের ঘাটতির ভয় হয়।

যুগ ডিজিটাল হচ্ছে। প্রযুক্তির নিত্য নতুন আবিষ্কারে আমাদের জীবন ভাসছে। সামাজিক আচার অনু্ষ্ঠানে কিংবা সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে গ্রামের বাড়ি কিংবা স্বজন-বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাতের চেয়ে ঘরে বসে টিভি কিংবা ইন্টারনেটে সময় কাটাতে ভালবাসেন অনেকেই। এতে শেকড়ের সঙ্গে প্রজম্মের বন্ধন দিনদিন যেমন দুর্বল হয়, তেমনি করে তা সামাজিক ক্ষেত্রেও মানুষকে বদলে দিতে সক্ষম হয়। ইট-কংক্রিটের খাঁচায় আবদ্ধ আমাদের নগরজীবন এভাবেই দিনদিন মায়া-মমতাহীন রুক্ষ ও অস্থির হয়ে যাচ্ছে। 

আত্নীয়তার বন্ধন থেকে আমাদের এমন দূরে সরে যাওয়া সমাজ-সংস্কৃতি তো বটেই, ইসলামের দৃষ্টিতেও নিন্দনীয়। স্বয়ং আল্লাহ পাক সূরা-নিসার প্রথম আয়াতে আমাদের আত্নীয়তার বন্ধন সম্পেকেৃকে সতর্ক করেছেন। সূরা ইসরার ২৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক আদেশ করেছেন, তোমরা নিকটাত্নীয়দের হক আদায় করো। সমাজের সবার সঙ্গে মেলামেশা, বিশেষ করে আত্নীয়-স্বজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও তাদের সঙ্গে মায়া-মমতা, ভালবাসা আর সম্প্রীতির সম্পর্ক চর্চার ক্ষেত্রে নবী করিম (সা.) আদর্শ অপূর্ব ও অতুলনীয়। তিনি নিজে যেমন এ ব্যাপারে সদা যত্নবান ছিলেন, ঠিক তেমনি ভাবে তাঁর সাহাবিদেরও এ ব্যাপারে নিয়মিত তাগিত ও উৎসাহ দিতেন।

বুখারি শরিফের বর্ণনায় হজরত আনাস (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, কেউ যদি চায় যে তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং মৃত্যুর পরও তার সুখ্যাতী স্থায়ী হোক, তবে সে যেন  তার আত্নীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে।

কোরআন সুন্নার আলোকে  আত্নীয়তার বন্ধন: আত্নীয়তার সম্পর্ক সুদৃঢ় রাখতে মানবজাতির হেদায়েতগ্রন্থ প্রবিত্র কোরআন  এবং নবী করিম (সা.) এর পবিত্র বাণী হাদিস শরিফ যথেষ্ঠ গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, যারা আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে দৃঢ় অঙ্গিকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে আল্লাহ তায়ালা আদেশ করেছের তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায় তাদেরই জন্য রয়েছে অভিশপ্ত এবং তাদেরই জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট আবাস।’(সূরা: রা’দ, আয়াত: ২৫)।

মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আত্নীয়তার বন্ধন বজায় রাখো।’ (সহিহুল জামে: ১০৮)।

তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা আত্নীয়তার সম্পর্ক আর্দ্র রাখো, যদিও তা সালাম দিয়ে হয়।’ সহিহুল জামে: ২৮৩৮)।

মানুষ সামাজিক জীব। আত্নীয়তা ছাড়া বেঁচে থাকা খুবই কষ্টকর। যে লোকের সঙ্গে তার আত্নীয়-স্বজন, পরিবার-পরিজনদের সম্পর্ক ভালো নেই তাকে আমরা অনায়েসেই একজন দুঃখী মানুষ বলে চিহ্নিত করতে পারি। সে যতই বড়লোক হোক বা বাইরে থেকে যতই সুখী মনে হোক।

একটি বিষয় খুবই লক্ষণীয় যে, আত্নীয়দের সঙ্গে যতই ঝগড়া, রাগ করুক না কেন এক সময় মানুষ তার ভুল বুঝতে পারে। বুঝতে পারে ‘আপনে তো আপনে হোতে হে’। আত্নীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে সুখ তো আছেই তার সঙ্গে আছে আয়ুবৃদ্ধি এবং রুজিতে বরকত। নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি পচ্ছন্দ করে যে, তার রুজি প্রশস্ত হোক এবং আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি হোক, সে যেন আত্নীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (বুখারি/মুসলিম)।

যেসব পাপ  বা গুনাহের শাস্তি আল্লাহ তায়ালা ইহকালেও দেন তার মধ্যে আত্নীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাও অন্যতম। আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন, ‘জুলুমবাজী ও রক্তের  আত্নীয়তা ছিন্ন করা ছাড়া এমন উপযুক্ত আর কোনো পাপাচার নেই; যার শাস্তি পাপাচারীর জন্য দুনিয়াতেই আল্লাহ অবিলম্বে প্রদান করেন এবং সে সঙ্গে আখিরাতের জন্যও জমা করে রাখেন ।’ (আহমাদ, তিরমিযী, আবূদাউদ, ইবনে মাজাহ/৪২১১, হাকেম সহিহুল জামে /৫৭০৪)।

তিনি আরো বলেন, আল্লাহর আনুগত্য করা হয় এমন আমলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাড়াতাড়ি যে আমলের সওয়াব পাওয়া যায় তা হলো আত্নীয়তার বন্ধন বজায় রাখা। আর যে বদ আমলের শাস্তি সত্বর দেয়া হয়, তা হলো বিদ্রোহ ও আত্নীয়তার বন্ধন ছেদন করা’(বায়হাকী, সহিহুল জামে/৫৩৯১)। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, আত্নীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘ছিন্নকারী জান্নাতে যাবে না’। (বুখারি/৫৯৮৪; মুসলিম/২৫৫৬, তিরমিযী)।

‘এবং যারা বজায় রাখে ওই সম্পর্ক, যা বজায় রাখতে আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন এবং স্বীয় পালনকর্তাকে ভয় করে এবং কঠোর হিসেবের আশঙ্কা রাখে।’ (সূরা: রা‘দ, আয়াত: ২১)। 

‘এবং যারা স্বীয় পালনকর্তার সন্তুষ্টির জন্যে সবর করে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করে আর আমি তাদেরকে যা দিয়েছি, তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং যারা মন্দের বিপরীতে ভালো করে, তাদের জন্য রয়েছে পরকালে শান্তির নিবাস।’ (সূরা: রা‘দ, আয়াত: ২২)।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আত্নীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। জুবাইর ইবনে মুতইম (রা.) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘আত্নীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (বুখারি শরিফ- অধ্যায় আচার ব্যবহার নম্বর: ৫৫৫৮)।

আল্লাহর অঙ্গীকারের দৃঢ় ও পাকা-পোক্ত করার পর তা ভঙ্গ করে। তার জন্য আল্লাহ তায়ালা কঠিন আজাব ও অভিশপ্ত করেছেন যারা এ সম্পর্ক অটুট রাখে না এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে। এবং যারা আল্লাহর অঙ্গীকারকে দৃঢ় ও পাকা-পোক্ত করার পর তা ভঙ্গ করে, আল্লাহ যে সম্পর্ক বজায় রাখতে আদেশ করেছেন, তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে, ওরা ওই সমস্ত লোক যাদের জন্য রয়েছে অভিশপ্ত এবং ওদের জন্যে রয়েছে কঠিন আজাব। (সূরা: রা‘দ, আয়ত: ২৫)।

আল্লাহ তায়ালা বলেন তারাই মুমিন যারা সন্দেহ পোষণ করে না। তারাই মুমিন যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না এবং আল্লাহর পথে প্রাণ ও ধন-সম্পদ দ্বারা জিহাদ করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ। (সূরা: আল হুজরাত, আয়াত: ১৫)।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন রাসূল (সা.) এর  হুকুম মান্য করাই আল্লাহর হুকুম মান্য করা।

যে লোক রাসূলের (সা.) হুকুম মান্য করবে সে আল্লাহর হুকুম মান্য করল। আর যে লোক বিমুখতা অবলম্বন করল, আমি আপনাকে (হে মুহাম্মাদ), তাদের জন্য রক্ষণাবেক্ষণকারী নিযুক্ত করে পাঠাইনি। (সূরা: আন-নিসা, আয়াত: ৮০)।

আত্নীয়তার হক রাহমানের মূল: রাসূল (স.) বলেছেন যে, আত্নীয়তার হক রাহমানের মূল। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, আয়িশাহ (রা.) থেকে বর্ণিত- রাসূল (স.) বলেছেন, আত্নীয়তার হক রাহমানের মূল। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, যে তা সজ্জীবিত রাখবে আমি তাকে সজ্জীবিত রাখবো। আর যে তা ছিন্ন করবে, আমি তাকে ছিন্ন করবো। (বুখারি শরিফ: অধ্যায় আচার ব্যবহার নম্বর: ৫৫৬৩)।

রিজিক প্রশস্তিকরণে আত্নীয়তার সম্পর্ক: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রিজিক প্রশস্ত আয়ু বৃদ্ধি যে চায় সে যেন তার আত্নীয়তার সম্পর্ক অক্ষুণ রাখে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি চায় যে তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বৃদ্ধি হোক, সে যেন তার আত্নীয়তার সম্পর্ক অক্ষুণ রাখে। (বুখারি শরিফ: অধ্যায় আচার ব্যবহার নম্বর: ৫৫৬০)।

আসুন আমরা সবাই আত্নীয়তার বন্ধনকে দৃঢ় রাখার মধ্যে দিয়ে সুন্দর ও সমৃদ্ধির সমাজ গঠনে ঐক্যবন্ধ হই।

সংগ্রহে: প্রিয়ম হাসান

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে