আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা ঈমানের দাবি (পর্ব-২) 

আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা ঈমানের দাবি (পর্ব-২) 

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:৩৮ ১৩ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ২১:৪২ ১৩ আগস্ট ২০২০

আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাসার দাবি সত্য হবে না, যে যাবৎ আল্লাহর সৃষ্টির সঙ্গে ভালোবাসা না হবে।

আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাসার দাবি সত্য হবে না, যে যাবৎ আল্লাহর সৃষ্টির সঙ্গে ভালোবাসা না হবে।

একটি মাছির প্রতি দয়া করা: এক বুযুর্গ ছিলেন যিনি অনেক বড় আলেম, ফাযেল, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ছিলেন। সারা জীবন অধ্যাপনা ও গ্রন্থ রচনায় কাটিয়েছেন এবং জ্ঞান ভাণ্ডারের সমুদ্র প্রবাহিত করেছেন। যখন তার মৃত্যু হয়ে গেল, কেউ তাকে স্বপ্নে দেখল। জিজ্ঞাসা করল- হজরত! আপনার সঙ্গে কেমন আচরণ হলো? তিনি বললেন-আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ, তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন।

আরো পড়ুন >>> আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা ঈমানের দাবি (পর্ব-১) 

কিন্তু একটি বিস্ময়কর ব্যাপার ঘটে গেল। আমার ধারণায় ছিল-আলহামদুলিল্লাহ! আমি জীবনে দ্বীনের অনেক খেদমত করেছি। দরস-তাদরীস, ওয়াজ, বক্তব্য, রচনা ও সংকলনের মাধ্যমে দ্বীনের সেবা করেছি। হিসাব কিতাবের সময় এসব সামনে এসে যাবে। এবং এর ফলে আল্লাহ তায়ালা স্বীয় অনুগ্রহ করবেন। তবে হলো এর বিপরীত। যখন আল্লাহ তায়ালার সম্মুখীন হলাম, আল্লাহ তায়ালা বললেন, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। তবে জান কি কারণে ক্ষমা করে দিয়েছি? কল্পনায় আসল, আমি যে খেদমত আঞ্জাম দিয়েছি, তার বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বললেন, না, আমি তোমাকে অন্য একটি কারণে ক্ষমা করে দিয়েছি। তা হলো, একদিন তুমি কিছু লিখছিলে। ওই সময়ে বাঁশের কলমে লেখা হতো। কলমকে কালির ভেতরে ডুবিয়ে আবার লেখা হতো। তুমি লেখার জন্য স্বীয় কলম কালিতে ডুবিয়েছ, ওই সময় একটি মাছি কলমের ওপর বসে গেল এবং মাছিটি কলমের কালি চুষতে লাগল। মাছিটি দেখে কিছুক্ষণের জন্য তুমি থেমে গেলে। চিন্তা করলে, মাছিটি পিপাসার্ত, একে কালি পান করতে দিই। আমি পরে লেখে নেব। তুমি সে সময় কলমকে বিরত রেখেছিলে। আমার ও আমার সৃষ্টির ভালোবাসায় খাঁটি মনেই বিরত রেখেছিলে। তোমার অন্তরে তখন অন্য কোনো অনুভূতি ছিল না। যাও, এ আমলের বিনিময়ে আজ তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।

তাসাউফ ও সৃষ্টির সেবা:

এটি বড় স্পর্শকাতর পথ। আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাসার দাবি সত্য হবে না, যে যাবৎ আল্লাহর সৃষ্টির সঙ্গে ভালোবাসা না হবে। এই জন্য মাওলানা রুমী রহ. তাসাউফের ব্যাপারে বলেন, হাতে তাসবীহ, বিছানো জায়নামাজ, তালিযুক্ত পোশাক, এগুলোকে মানুষ তাসাউফ নাম করন করেছে। আসলে এগুলো তাসাউফ ও তরীকত  কোনোটাই নয়। বরং তাসাউফ তো সৃষ্টির সেবা বৈ আর কিছু নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, যদি আমার সঙ্গে তোমাদের ভালোবাসার দাবি হয়, তাহলে আমার সৃষ্টিকে ভালোবাস, তাদের সেবা করো।

সৃষ্টির সঙ্গে স্রষ্টার ভালোবাসা:

আল্লাহ তায়ালা তার সৃষ্টিকে ভালোবাসেন। এটা পরীক্ষা করে দেখুন, কেউ যদি স্বীয় হাতে পরিশ্রম করে কোনো জিনিস তৈরি করে, চাই সেটা পাথরই হোক না কেন, তাহলে নির্মাতার নির্মিত পাথরের প্রতি ভালোবাসা হয়ে যায়। কারণ সে পাথর তৈরিতে সময় ব্যয় করেছে। বলবে, আমি পরিশ্রম করেছি। এটা আমার সম্পদ। এভাবে আল্লাহ তায়ালা স্বীয় সৃষ্টিকে বানিয়েছেন, সৃষ্টি করেছেন। তাই সৃষ্টির প্রতি তার ভালোবাসা রয়েছে। অতএব, তাকে ভালোবাসার দাবি করলে তার সৃষ্টিকে ভালোবাসতে হবে।

হজরত নুহ (আ.) এর বিস্ময়কর ঘটনা:

হজরত নুহ (আ.) এর পুরো সম্প্রদায় প্লাবনে ধ্বংস হয়ে গেছে। এরপর আল্লাহ তায়ালা ওহির মাধ্যমে নুহ (আ.)-কে নির্দেশ দিলেন, এখন তোমার কাজ হলো-তুমি মাটির পাত্র বানাও। হজরত নুহ (আ.) আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ পালনে মাটির পাত্র বানাতে শুরু করলেন। এতে দিন-রাত সময় ব্যয় করছেন। যখন কয়েকদিন চলে গেল, বহু পাত্র তৈরি হয়ে গেল, এবার দ্বিতীয় নির্দেশ দিলেন, এসব পাত্রকে একেকটি করে ভাঙ্গো। হজরত নুহ (আ.) নিবেদন করলেন, হে আল্লাহ! আমি বড় পরিশ্রম করে আপনার নির্দেশে তৈরি করেছি। এখন আপনি ভাঙ্গার নির্দেশ দিচ্ছেন! আল্লাহ তায়ালা বললেন, আমার নির্দেশ-এখন এগুলোকে ভাঙ্গো। হজরত নুহ (আ.) এগুলো ভেঙ্গে ফেললেন, তবে অন্তর ব্যথিত হলো- এতো পরিশ্রম করে বানিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছি। আল্লাহ তায়ালা বললেন, হে নুহ! আমার নির্দেশে নিজ হাতে এ পাত্রগুলো তৈরি করেছ। এ পাত্রগুলোর প্রতি তোমার এত ভালোবাসা হয়ে গেছে যে, যখন আমি তোমাকে এগুলো ভাঙ্গার নির্দেশ দিলাম তুমি ভাঙ্গতে চাচ্ছিলে না। চাচ্ছিলে এ পাত্রগুলো আমার পরিশ্রমে স্বহস্তে তৈরি হয়েছে, কোনো রকমে ভাঙ্গা থেমে গেলে ভালো হয়। কারণ পাত্রগুলোর সঙ্গে তোমার ভালোবাসা সৃষ্টি হয়ে গেছে। তবে তুমি আমার বিষয়টি চিন্তা করলে না। সমস্ত মাখলূক আমি স্বহস্তে তৈরি করেছি। তুমি একবার বলে দিলে,

رب! لا تذر على الأرض من الكٰـفرين ديارا

‘হে আল্লাহ! পৃথিবীতে বসবাসকারী সব কাফেরকে ধ্বংস করে দিন, তাদের কেউ যেন বাকি না থাকে।’

তোমার বলার পর আমি স্বীয় মাখলুককে ধ্বংস করে দিয়েছি। সে বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত দিলেন- যে মাটি দিয়ে পাত্র তৈরি করেছিলে, তা তোমার সৃষ্ট বস্তু ছিল না। তুমি স্বেচ্ছায় পাত্র তৈরি করছিলে না বরং আমার নির্দেশে তৈরি করছিলে। তবুও এগুলোর সঙ্গে তোমার হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল। তবে কি স্বীয় সৃষ্টির সঙ্গে আমার ভালোবাসা সৃষ্টি হবে না? অবশ্যই মুহাব্বত সৃষ্টি হবে। অতএব, আমাকে ভালোবাসতে হলে আমার সৃষ্টিকে ভালোবাসতে হবে।

আউলিয়ায়ে কেরামের অবস্থা:

বিগত আউলিয়ায়ে কেরামের অবস্থা হলো, যদি  কোনো মাখলুককে মন্দ অবস্থায় দেখতেন, গুনাহ ও পাপ জড়িত দেখতেন, তখন তারা ওই পাপকে ঘৃণা করতেন। কারণ পাপকে ঘৃণা করা ওয়াজিব। তবে অন্তরে ওই পাপীর প্রতি ঘৃণা হতো না এবং তার হেয়তা অন্তরে হতো না।

হজরত জোনায়েদ বাগদাদী রহ. এর ঘটনা:

হজরত জোনায়েদ বাগদাদী রহ. দজলা নদীর পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। নদীর কূল ঘেঁষে একটি নৌকা যাচ্ছিল। নৌকায় লম্পট জাতীয় কিছু নওজোয়ান বসে গান-বাদ্য বাজিয়ে যাচ্ছিল। যখন গান বাজনা হয়, হাসি মজাক হয়, আর তার পাশ দিয়ে কোনো মৌলভী অতিক্রম করে, তখন মৌলভী সাহেবকে নিয়ে বিদ্রুপ করা বিনোদনের অংশ হয়। সেই সূত্রেই লম্পট লোকেরা হজরত জোনায়েদ বাগদাদী রহ. কে নিয়ে বিদ্রুপাত্মক কথাবার্তা বলল। হজরতের সঙ্গে আরেকজন লোক ছিল। এ অবস্থা দেখে সে বলল, হজরত! তাদের জন্য বদ দোয়া করুন। কারণ এরা এতটা বেয়াদব, একদিকে নিজেরা পাপাচারে লিপ্ত আছে, অন্যদিকে আল্লাহওয়ালাদের সঙ্গে উপহাস করছে। জোনায়েদ বাগদাদী রহ. তৎক্ষণাত দোয়ার জন্য হাত উঠালেন। বললেন, হে আল্লাহ! তুমি তাদেরকে এই পৃথিবীতে যেমন আনন্দ দান করেছ, তাদের কর্মকে এমন করে দাও যাতে তারা পরকালেও আনন্দ করতে পারে। দেখুন, ব্যক্তিকে ঘৃণা করেনি। কারণ তারা আমার আল্লাহর মাখলূক।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদারতা:

সমস্ত পৃথিবীর রহমত স্বরূপ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রেরণ করা হয়েছে। কাফেরদের পক্ষ থেকে যখন ইট-পাথর মারা হচ্ছিল, তার পা মোবারক রক্তাক্ত হয়েছিল, তখন তার মুখে এ দোয়া জারি ছিল-

اللهم اهد قومي، فإنهم لا يعلمون

‘হে আল্লাহ! আমার সম্প্রদায়কে হেদায়েত করুন, কারণ তারা জানে না।’ না জেনে এ আচরণ করছে, তাদেরকে হেদায়েত করুন। মুখে এ দোয়ার শব্দ এ জন্য ছিল যে, কাফের কর্মের প্রতি ঘৃণা ছিল, তবে তাদের সত্তার প্রতি ঘৃণা ছিল না। সত্তা হিসেবে তারা আমার আল্লাহর মাখলূক। আল্লাহর মাখলূকের সঙ্গে আমার ভালোবাসা রয়েছে।

পাপীকে ঘৃণা করো না:

মনে রাখতে হবে, অন্যায়, গুনাহ ও পাপকে ঘৃণা না করাও পাপ। পাপকে অবশ্যই ঘৃণা করা চাই। একে মন্দ মনে করা চাই, তবে পাপীকে হেয় বা ঘৃণা করা যাবে না বরং তার ওপর করুণা করা চাই। যেমন কেউ অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তারের কাজ এটা নয় যে তার প্রতি অসন্তুষ্ট হবে; বলবে, তুমি কেন অসুস্থ হলে? বরং ডাক্তার তার ওপর দয়াপরবশ হয়, আহা বেচারা অসুস্থ হয়ে পড়েছে ও তার চিকিৎসা করে এবং তার জন্য দোয়া করে- হে আল্লাহ! তাকে আরোগ্য দান করো। অনুরূপ আচরণ হওয়া চাই ফাসিক ও পাপী ব্যক্তির সঙ্গে। ঘৃণা হবে তার পাপ ও অন্যায়ের প্রতি। পাপী ব্যক্তির প্রতি নয়। বরং ব্যক্তিকে এই হিসেবে ভালোবাসবে যে, সে আমার আল্লাহর মাখলূক। তার জন্য দোয়া করবে, আল্লাহ তাকে যেন সঠিক পথে নিয়ে আসে।

এক ব্যবসায়ীর ক্ষমার বিস্ময়কর ঘটনা:

হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, এক ব্যক্তি কেয়ামতের দিন হিসাব কিতাবের সময় আল্লাহ তায়ালার সম্মুক্ষীন হলো, তবে পেছনে এর কোনো নমুনা নেই। আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের বলবেন, তার আমলনামা দেখ, সে কি কি আমল করেছে। ফেরেশতারা দেখে জানতে পারল, তার আমলনামা নেকী থেকে প্রায় খালি। না নামাজ, না রোজা, না অন্য  কোনো ইবাদত। দিন-রাত শুধু ব্যবসা করত। আল্লাহ তায়ালা সমস্ত বান্দাদের ব্যাপারে সবকিছু জানেন। তবে অন্যদের সামনে প্রকাশ করার জন্য ফেরেশতাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, একটু ভালো করে দেখ তো  কোনো নেক আমল আছে কি না। তখন ফেরেশতারা নিবেদন করবে, হ্যাঁ, তার একটি নেক আমল আছে। তা হলো, এ লোকটি যদিও বিশেষ কোনো নেক আমল করেনি, তবে সে ব্যবসা করত, স্বীয় গোলামদেরকে ব্যবসা পণ্য দিয়ে বিক্রয়ের জন্য পাঠাত। সে তার গোলামদেরকে এই নির্দেশ দিয়ে রেখেছিল যে, যদি  কোনো দরিদ্র লোকের কাছে পণ্য বিক্রয় কর, তার সঙ্গে নম্র আচরণ করবে। যদি তাকে ঋণ দাও তাহলে ঋণ উসূলের ক্ষেত্রে কঠোরতা অবলম্বন করো না। কখনো সখনো ক্ষমাও করে দিও। সারা জীবন ব্যবসায় তার এই নীতির ওপর চলেছে। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, আচ্ছা, সে আমার বান্দাদের ক্ষমা করে দিতো। আমি তাকে ক্ষমা করে দেয়ার অধিক উপযুক্ত। এরপর ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিলেন, এর সঙ্গে ক্ষমার আচরণ করো এবং তাকে জান্নাতে পাঠিয়ে দাও। বান্দার সঙ্গে ক্ষমার সুন্দর আচরণ করা আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।

চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে