আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা ঈমানের দাবি (পর্ব-১) 

আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা ঈমানের দাবি (পর্ব-১) 

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:১৬ ৬ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১৮:২০ ৬ আগস্ট ২০২০

‘যে ব্যক্তি যতটুকু সময় স্বীয় ভাইয়ের কাজ ও প্রয়োজন পূর্ণ করতে লেগে থাকবে, আল্লাহ তায়ালা তার কাজ ও প্রয়োজন পূর্ণ করতে থাকবেন।’

‘যে ব্যক্তি যতটুকু সময় স্বীয় ভাইয়ের কাজ ও প্রয়োজন পূর্ণ করতে লেগে থাকবে, আল্লাহ তায়ালা তার কাজ ও প্রয়োজন পূর্ণ করতে থাকবেন।’

প্রিয়নবী রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,

عن أبي هريرة رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه و سلم قال : من نفس عن مؤمن كربة من كرب الدنيا، نفس الله عنه كربة من كرب يوم القيامة. و من يسر على معسر، يسر الله عليه في الدنيا و الآخرة. و من ستر مسلما، ستره الله في الدنيا و الآخرة. و الله في عون العبد ما كان العبد في عون أخيه. و من سلك طريقا يلتمس فيه علما، سهل الله به طريقا في الجنة. و ما اجتمع قوم في بيت من بيوت الله تعالى-يتلون كتاب الله يتدارسون بينهم-إلا نزلت عليهم السكينة و غشيتهم الرحمة و حفتهم الملائكة و ذكرهم الله فيمن عنده. و من بطأ به عمله، لم يسرع به نسبه .

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই হাদিসের বর্ণনাকারী হজরত আবূ হুরায়রা (রা.)। এ হাদিসের প্রথম বাক্যে ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব কোনো অস্থিরতা দূর করবে, অর্থাৎ মুমিন কোনো অস্থিরতায় বা বিপদে আক্রান্ত হয় আর কোনো মুসলমান স্বীয় কাজ ও সাহায্যের মাধ্যমে তা দূর করে দেয়, তার এ কাজ এত বড় সওয়াবের যে, আল্লাহ তায়ালা এর বিনিময়ে কেয়ামতের দিনের কাঠিন্য ও অস্থিরতাসমূহের একটি দূর করে দেবেন।

অভাবীকে অবকাশ দেয়ার ফজিলত:

দ্বিতীয় বাক্যে ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোনো অভাবী মানুষকে সহজ করে দেয়, আল্লাহ তায়ালা তার ইহ-পরকালের কার্যাবলী সহজ করে দেবেন। যেমন এক ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত। সে তার  কোনো প্রয়োজনে ঋণ নিয়েছে এবং নির্দিষ্ট সময়ে তা পরিশোধ করার ওয়াদা করেছে। তবে যখন ঋণ পরিশোধের সময় আসল, অভাবে কারণে সে তা পরিশোধ করতে পারছে না। এখন যদিও ঋণদাতার অধিকার আছে ঋণ চাওয়ার- আমার ঋণ পরিশোধ কর, তবে যদি ঋণদাতা অভাবীকে সুযোগ দেয়, বলে-যখন তোমার সামর্থ হবে তখন পরিশোধ করো। এমন ব্যক্তির জন্যই বলেছেন-আল্লাহ তায়ালা ইহ-পরোকালে তার কাজ সহজ করে দেবেন। এ ব্যাপারে কোরআনে কারিমে ইরশাদ করেন,

و إن كان ذو عسرة فنظرة إلى ميسرة

অর্থাৎ: তোমার ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদি দরিদ্র হয়, তাহলে একজন মু’মিনের কাজ হলো তাকে সুযোগ দেবে যতক্ষণ না তার হাত খুলে যায়, তার দারিদ্র দূর হয়ে যায় এবং তার মাঝে ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা সৃষ্টি হয়ে যায়।

নম্রতা আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রিয়:

আল্লাহ তায়ালার কাছে নম্রতা অনেক প্রিয়। আল্লাহর বান্দাদের সঙ্গে নরম আচরণ করা আল্লাহ তায়ালার কাছে অধিক প্রিয় কাজ। যে ব্যক্তি ঋণ দেয়, ঋণ উসূল করার জন্য আইনত সর্বদাই চাওয়ার অধিকার আছে। এমন কি তাকে বন্দিও করতে পারে। তবে একজন মুসলমানের কাছে ইসলামের দাবি হলো, সে শুধু পয়সা দেখবে না। কত পয়সা এল আর কত পয়সা গেল। বরং দেখবে আল্লাহর কোনো বান্দার সঙ্গে নম্র আচরণ করা আল্লাহ তায়ালার কাছে অত্যন্ত প্রিয় এবং এর বিনিময়ে কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তার সঙ্গে নম্র আচরণ করবেন।

মুসলমানের প্রয়োজন পূর্ণ করার ফজিলত:

অন্য একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

من كان في حاجة أخيه، كان الله في حاجته

‘যে ব্যক্তি যতটুকু সময় স্বীয় ভাইয়ের কাজ ও প্রয়োজন পূর্ণ করতে লেগে থাকবে, আল্লাহ তায়ালা তার কাজ ও প্রয়োজন পূর্ণ করতে থাকবেন।’

অন্য একটি বাক্যে ইরশাদ করেন,
 
من فرج عن مسلم كربة، فرج الله عنه كربة من كرب يوم القيامة

‘যদি কেউ  কোনো মুসলমানের বিপদ দূর করে দেয়, আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন তার বিপদ ও পেরেশানী দূর করে দেবেন।’

আল্লাহর সৃষ্টির পর দয়া কর:

আসলে এ দুটি কাজ তথা অন্যের প্রয়োজন করা এবং অন্যের বিপদ পেরেশানী দূর করা তখনই  সম্ভব, যখন হৃদয়ে আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি দয়া ও ভালোবাসা থাকবে। যদি এ দুটি কাজই লৌকিকতার জন্য করে তাহলে এর  কোনো মূল্য নেই। আর যদি এটা চিন্তা করে, তারা আমার আল্লাহর বান্দা, তার সৃষ্টি, আমি তাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করলে আল্লাহ তায়ালা আমাকে এর বিনিময় দেবেন। তখন এ কাজ মূল্যবান হয়ে যাবে। আল্লাহর ভালোবাসার দাবি হলো তার বান্দাদের ভালোবাসা। যদি বান্দাকে ভালো না বাসে, তার অর্থ হলো সে আল্লাহকে ভালোবাসে না। এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

ارحموا من في الأرض، يرحمكم من في السماء

‘যারা অন্যের প্রতি দয়া করে, আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীবাসীর ওপর দয়া করো, আকাশে যিনি আছেন তিনি তোমাদের ওপর দয়া করবেন।’ অতএব, যাবৎ আল্লাহর সৃষ্টির জন্য তোমাদের অন্তরে দয়া না হবে, তাবৎ তোমরা মুসলমান বলার উপযুক্ত না। আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি দয়া না করলে আল্লাহর রহমতের আশাবাদী কী করে হবে? ঈমানের একটি দাবী তো হলো-আল্লাহর বান্দা ও সৃষ্টিকে ভালোবাসা।

লায়লার দেয়াল-দরজার সঙ্গে মজনুর ভালোবাসা:

যখন কোনো প্রেমাষ্পদের সঙ্গে ভালোবাসা হয়ে যায়, তখন ওই প্রেমাষ্পদের প্রতিটি জিনিসের প্রতি ভালোবাসা হয়ে যায়। মজনু লায়লার ভালোবাসায় বলে,
 
أمر على الديار ديار ليلى * أقبل ذا الديار و ذا الديار

‘লায়লার নিবাসের পাশ দিয়ে যখন আমি গমন করি, কখনো ওই প্রাচীরকে আর কখনো এই প্রাচীরকে আমি চুমু খাই।’
  
و ما حب الديار شغفن قلبي * و لكن حب من سكن الديارا

‘ওই প্রাচীরের সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক? কেন আমি তাকে ভালোবাসব? তবে যেহেতু এ প্রাচীর আমার প্রেমাষ্পদের শহরের প্রাচীর, এ জন্য আমি এ প্রাচীরকে ভালোবাসি। যখন আমি তার পাশ দিয়ে গমন করি, তখন এ প্রাচীরকে চুমু খেয়ে ফিরি।’

যখন এক মজনুর লায়লার শহরের প্রাচীরের সঙ্গে প্রেম-ভালোবাসা হয়ে যায়, তাহলে কী কারণ থাকতে পারে যে আল্লাহর সঙ্গে ভালোবাসা হবে আর আল্লাহর সৃষ্টি মাখলুকের সঙ্গে ভালোবাসা হবে না? আল্লাহর সৃষ্টি বান্দার সঙ্গে সম্পর্ক হবে না? তাদের প্রতি দয়া হবে না? এটা কেমন ভালোবাসা?

আল্লাহর ভালোবাসা কি লায়লার চেয়ে কম?

মসনবী শরিফে মাওলানা রুমী রহ. বলেন, লায়লার শহরের কুকুরের সঙ্গেও মজনুর ভালোবাসা ছিল। কারণ এটা আমার প্রেয়সীর শহরের কুকুর, তার সঙ্গেও আমার ভালোবাসা থাকা চাই। মাওলানা রুমী রহ. বলেন, (উর্দু) ‘আরে! মাওলার ভালোবাসা লাইলার ভালোবাসার চেয়ে কম হয়ে গিয়েছে। যখন এক ক্ষণস্থায়ী, ধ্বংসশীল বস্তুর সঙ্গে এত ভালোবাসা হয়ে যায় যে, তার কুকুরকেও ভালোবাসতে থাকে, তখন আল্লাহ তায়ালা-যিনি সমস্ত রাজ্যের অধিপতি এবং প্রেমাষ্পদের প্রেমাষ্পদ-তার ভালোবাসার দাবি তো হলো তার সব সৃষ্টির সঙ্গেও ভালোবাসা হয়ে যাবে। চাই সে প্রাণীই হোক না কেন। কারণ সে আমার আল্লাহর সৃষ্টি। এই জন্য শরীয়ত প্রাণীদেরও অধিকার দিয়েছে। তাদের সঙ্গে দয়ার আচরণ করো, তাদের প্রতি যেন কোনো যুলুম না হয়ে যায়।’

কুকুরকে পানি পান করানোর সওয়াব:

বুখারি শরিফে একটি ঘটনা বিবৃত হয়েছে। একজন পতিতা নারী ছিল। সারা জীবন পতিতাবৃত্তি করেছে। একবার সে কোথাও থেকে যাচ্ছিল। রাস্তায় সে দেখল একটি কুকুর তীব্র পিপাসার কারণে জমিনের মাটি চাটতে থাকে। পাশেই একটি কূপ ছিল। সে নারী তার পায়ের চামড়ার মোজা খুলল এবং তদ্বারা কূপ থেকে পানি বের করল। কুকুরকে পানি পান করালো। আল্লাহ তায়ালার কাছে তার এ কাজ এত পছন্দ হয়েছে যে তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন যে- আমার সৃষ্টির সঙ্গে দয়া ও ভালোবাসার আচরণ করেছো, আমি তোমার সঙ্গে দয়ার আচরণ করার অধিক হকদার। অতএব, আল্লাহর সৃষ্টির সঙ্গে দয়ার আচরণ করা চাই। চাই সে প্রাণীই হোক না কেন।

দয়ার সুউচ্চ মাকাম:

হজরত মাওলনা মাসীহুল্লাহ খান সাহেবকে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির প্রতি দয়া করার বিস্ময়কর যোগ্যতা দান করেছিলেন। কখনো  কোনো প্রাণীকে মারবে তো দূরের কথা,  কোনো প্রাণীকে তার স্থান থেকে সরাতেও হাত উঠাতেন না। এটা চিন্তা করে যে-আল্লাহর মাখলূক। একবার তার পা যখম হয়ে গিয়েছে। এ যখমে মাছি বসতে থাকে। যখমে মাছি বসলে তো একটু কষ্ট হয়ই। তবে তিনি মাছি সরাতেন না। বরং তিনি স্বীয় কাজে ব্যস্ত থাকতেন। ওই সময় একজন লোক তার কাছে আসল। সে যখন এ অবস্থা দেখল, নিবেদন করল- হজরত! অনুমতি দিন, মাছি সরিয়ে দিই। উত্তরে হজরত বললেন-ভাই! এ মাছিগুলো তাদের কাজ করছে। আমাকে আমার কাজ করতে দাও। কারণ অন্তরে এ ভাবনা ছিল যে, এরা আমার আল্লাহর মাখলূক। এদেরকে এখান থেকে সরিয়ে কেন পেরেশান করব? যথার্থ অর্থে আল্লাহর ভালোবাসা ওই সময়ই হবে, যখন আল্লাহর সৃষ্টিকে ভালোবাসবে, তার ওপর দয়া করবে।

চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে