আলোচিত সগিরা হত্যার চার্জশিট জমা দিচ্ছে পিবিআই

আলোচিত সগিরা হত্যার চার্জশিট জমা দিচ্ছে পিবিআই

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:৩৭ ১৬ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১১:৫২ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

আজ বহুল আলোচিত সগিরা মোর্শেদ হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল করতে যাচ্ছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। 

বৃহস্পতিবার ধানমন্ডি পিবিআই সদর দফতরে প্রেস বিফ্রিংয়ে একথা জানান পিবিআইয়ের প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার।

পিবিআই সদর দফতরে প্রেস বিফ্রিং

তিনি বলেন, আটজন সাক্ষীর ভিত্তিতে এই চার্জশিট বৃহস্পতিবার দুপুরে আদালতে জমা দেয়া হবে।

আসামিরা হলেন- সগিরা মোর্শেদের স্বামীর ভাই ডা. হাসান আলী চৌধুরী, তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহীন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তা আনাস মাহমুদ রেজওয়ান ও আবাসন ব্যবসায়ী মারুফ রেজা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১০ নভেম্বর মামলার সন্দেহভাজন আসামি আনাছ মাহমুদ ওরফে রেজওয়ানকে (৫৯) ঢাকার রামপুরা থেকে গ্রেফতার করা হয়। তার স্বীকারোক্তিতে ১২ নভেম্বর ডা. হাসান আলী চৌধুরী (৭০) ও তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহিনকে (৬৪) ধানমন্ডি থেকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের দেয়া তথ্যে ১৩ নভেম্বর মো. মারুফ রেজাকে (৫৯) বেইলি রোডের বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। 

সন্দেহভাজন আসামিরা

গ্রেফতাকৃতরা আদালতে সগিরা হত্যায় নিজেদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দী দেন। এজন্য এ চারজনকে অভিযুক্ত করে সগিরা মোর্শেদ হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল করা হচ্ছে। তবে আগের তদন্তকারী কর্মকর্তা যেহেতু মিন্টু নামে এক ছিনতাইকারীকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দিয়েছিলেন, এজন্য তার নামও চার্জশিটে রাখা হচ্ছে। তবে তদন্তে সগিরা মোর্শেদ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মিন্টুর কোনো সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়নি।

যেভাবে হত্যাকাণ্ডটি হয়
ঢাকার রাজারবাগ পেট্রোল পাম্পের কাছের ৯৫৫ নম্বর আউটার সার্কুলার রোডের পৈত্রিক বাড়ির দ্বিতীয় তলায় বসবাস করত সগিরা। তৃতীয় তলায় থাকত মাহমুদা শাহীন। উপর থেকে ময়লা ফেলার প্রতিবাদ করায় এবং সগিরার গৃহকর্মী জাহিনুর বেগম একদিন ভুলবশত মাহমুদা শাহীনের দরজার সামনে থু থু ফেললে দুই পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে।

সগিরা মোর্শেদকে শায়েস্তা করার জন্য শাহীনের স্বামী ডা. হাসান আলী তার রোগী তৎকালীন সিদ্বেশ্বরী এলাকার নামকরা সন্ত্রাসী মারুফ রেজাকে বলেন। মারুর রেজা তৎকালীন এরশাদ সরকারের প্রভাবশালী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল মাহমুদুল হাসানের আপন ভাগ্নে। ডা. হাসান আলী চৌধুরী সগিরা মোর্শেদকে শায়েস্তা করার জন্য মারুফ রেজাকে ২৫ হাজার টাকা দেয়। এছাড়া তিনি তার শ্যালক আনাস মাহমুদ রেজোয়ানকে মারুফ রেজার সহযোগী হিসেবে কাজ করতে পাঠান।

১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই বিকেলে আনাস মাহমুদ রেজওয়ান ও মারুফ রেজা মোটরসাইকেলযোগে সগিরার পিছু নেয়। রিকশাযোগে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সামনে গেলে মোটরসাইকেল দিয়ে তারা রিকশা অবরোধ করে। মারুফ রেজা সগিরার হাতে থাকা স্বর্ণের বালা ও হাতব্যাগ ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে।

সগিরা আনাস মাহমুদকে চিনে ফেলে ধমক দেন। এ সময় মারুফ রেজা সগিরার হাতব্যাগ ছেড়ে দিয়ে সগিরাকে কোমর থেকে রিভলভার বের করে গুলি করে। প্রথম গুলিটি সগিরার হাতে লাগে। দ্বিতীয় গুলিটি বাম বুকে বিদ্ধ হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সগিরার মৃত্যু হয়। মারুফ রেজা আরো দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে মোটরসাইকেলযোগে দু’জনই পালিয়ে যায়।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের এক দীর্ঘ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য। 

ঘটনার ত্রিশ বছর পর মূল প্রত্যক্ষদর্শীকে খুঁজে বের করা
আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর পিবিআই এর তদন্ত দল পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ থেকে মামলার ফাইলটি নিয়ে আসেন। পুরো ঘটনা বিশ্লেষণ করে তদন্ত কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল একাধিকবার পরিদর্শন করেন এবং খোঁজ খবর নিয়ে তারা জানতে পারেন এই এলাকায় বহুবার চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কখনো কাউকে হত্যা করা হয়নি।

বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার একমাত্র উপায় ছিল ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সেই রিকশাচালক আবদুস সালামতে খুঁজে বের করা। যার বয়স বর্তমানে ৫৫ বছর। মামলার ফাইলে তার ঠিকানা দেয়া ছিল জামালপুর জেলায়। সেটার সূত্র ধরে পুলিশ তার অবস্থান নির্ণয় করতে গিয়ে জানতে পারেন তিনি বর্তমানে ঢাকায় আছেন। কিন্তু তার কোনো ঠিকানা বা ফোন নম্বর পাওয়া যায়নি।

এরপর পুলিশ টানা কয়েক মাস ভিকারুননেসা নূন স্কুলের আশেপাশের রিকশা গ্যারেজগুলোয় প্রবীণ রিকশাচালকদের থেকে খোঁজ খবর নিতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে আবদুস সালামের খোঁজ দেন। তবে তিনি তার কোনো ঠিকানা দিতে পারেননি। আবদুস সালাম প্রতিদিন একটি দোকানে আসেন, পুলিশকে ওই রিকশাচালক সেই দোকানের ফোন নম্বরটি দেন। পরে ওই নম্বরে তদন্ত কর্মকর্তারা যোগাযোগ করলে দোকান কর্মকর্তা জানান, আবদুস সালাম তার পাশেই রয়েছে।

পরে ফোনে তার কাছে জানতে চাওয়া হয় এই ১৯৮৯ সালের ঘটনা সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন কিনা। আবদুস সালাম বলেন যে তিনি এ বিষয়ে জানেন। পরে তাকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বের হয় আসল রহস্য। অবশেষে এ আলোচিত হত্যা মামলা আলোর মুখ দেখে।

উল্লেখ্য, সগিরা মোর্শেদ বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক ছিলেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/ইএ/টিআরএইচ/আরএইচ/