আর্তের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ আরো সুসংবদ্ধ হতে হবে

আর্তের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ আরো সুসংবদ্ধ হতে হবে

প্রকাশিত: ১৪:৪১ ৩০ এপ্রিল ২০২০  

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। সত্তর ও আশির দশকে ‘শাহনাজ কালাম’ লেখক নামে ছড়া ও গল্প লিখিয়ে হিসেবে পরিচিত হলেও পেশা জীবনে এসে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পাঠক্রমভিত্তিক গ্রন্থ রচনা এবং শিল্প-সংস্কৃতি ও প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ক গ্ৰন্থ ও প্ৰবন্ধ লেখায় বিশেষ মনোনিবেশ করেন। ড. শাহনাওয়াজের রচিত ও সম্পাদনাকৃত গ্রন্থের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। এক যুগের বেশি সময়কাল ধরে তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে রাজনীতি ও সমাজ-সংস্কৃতি বিষয়ক কলাম লিখে আসছেন।

ক্ষুধার চেয়ে বড় সত্য আর আতঙ্ক অন্য কিছু নয়। সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ ক্ষুধার বাস্তবতা বয়ে বেড়াচ্ছে। প্রাগৈতিহাসিক কালপর্বের প্রথম পর্যায়ে অর্থাৎ পুরোপলীয় যুগে মানুষ খাদ্য উৎপাদন করতে জানতো না।

সারা দিনমান বনে বনে ঘুড়ে বেড়াতো খাদ্যের খোঁজে। বনের পশু আর গাছের ফলমূল তার এক মাত্র আশা আর আশ্বাস। এ পর্বেই ধীরে ধীরে দলবদ্ধ হয় মানুষ। ঘর বানাতে পারতো না বলে পাহাড়ের গুহায় বসবাস করতো। সে যুগের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণও বলছে এসময় মানুষের প্রধান চ্যালেঞ্জই ছিল ক্ষুধা নিবৃত করা। প্রাচীন গুহাচিত্রগুলো সে সত্যের প্রমাণ হিসেবে এখনো কথা বলছে।

পৃথিবীর প্রাগৈতিহাসিক যুগের সকল গুহাচিত্রের মোটিফই হচ্ছে শিকারি জীবনকে চিত্রিত করার চেষ্টা। গবেষকগণ মনে করতেন এই গুহাবাসীদের প্রধান চ্যালেঞ্জই হলো খাদ্য অন্বেষণ করা। গুহাবাসী মানুষ দলবদ্ধ হয়ে প্রতিদিন বেরিয়ে পড়তো গুহা থেকে। এদের মধ্যে হয়তো আঁকিয়ে পুরোহিত ছিলেন। শিকারের সন্ধানে দলটি বেরুনো আগে তিনি কোনো এক অদৃশ্য শক্তির উদ্দেশ্যে ছবি উৎসর্গ করতেন। প্রত্যাশা থাকতো শিকার-যাত্রা যাতে ব্যর্থ না হয়। ছবির মতই শরবিদ্ধ হোক বাইসন বা বল্গাহরিণ। না হলে যে না খেয়ে থাকতে হবে পুরো দলটিকে। এভাবে অনাদিকাল থেকে ক্ষুধা মেটানোর তাগিদকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখতে হয়েছে মানুষকে। ক্ষুধার রাজ্যে আসলেই গদ্যময় মনে হবে পুরো পৃথিবী। মৃত্যুভয়ও সেখানে তুচ্ছ। 

আজ করোনা আক্রান্ত দেশেও আমরা এ সত্যকে পুরোপুরি অনুভব করি। ক্ষুধার অন্ন যোগানোর তাগিদে করোনা আক্রান্ত হওয়ার ভয়ানক সত্যকে অগ্রাহ্য করে অনেকেই লকডাউন না মেনে পথে নেমে আসছে কাজ বা ত্রাণের সন্ধানে। তাই লকডাউন বাস্তবায়ন করে পরিবার, সমাজ ও দেশের মানুষকে রক্ষা করতে হলে মানুষকে নিশ্চিত করতে হবে যে তার ক্ষুধার অন্নের দায়িত্ব নিয়েছে সরকার ও সামর্থবান মানুষ। 

সরকার শুরু থেকে এই বাস্তবতার প্রতি নজর রেখেছে। নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বেসরকারি উদ্যোগের কথাও মাঝে মাঝে শোনা যায়। তবে সবচেয়ে কঠিন সত্য হচ্ছে একটি মানুষের প্রতিদিনকার সঙ্গে হচ্ছে ক্ষুধা। বেসরকারি উদ্যোগ দেশজুড়ে নয় কোনো কোনো বিশেষ অঞ্চলের কিছু কিছু মানুষ হয়তো খাদ্য সহযোগিতা পেয়ে থাকে। এ সহযোগিতাও সার্বক্ষণিকের জন্য নয়। হয়তো একবার মহাসমারোহে ত্রাণ বিতরণ হলো তাতে কিছু সংখ্যক পরিবারের তিন চার দিন বা বড়জোর এক সপ্তাহ চলার মতো বন্দোবস্ত হলো, বাকি দিনগুলোর কী হবে! আবার ত্রাণ পাওয়ার বাইরে আছে বড় সংখ্যক মানুষ। তাদের মানবেতর জীবনের খোঁজ কি আমরা করতে পারছি? 

সতের কোটি মানুষের দেশে আমাদের ধারণা উল্লেখযোগ্য অংশ মানুষের আয় রোজগারহীন ঘরে তিন বেলা খাবারের সংস্থান নেই। যারা পূর্ণকালীন খাবারের নিশ্চয়তা পাচ্ছে না তারা পেটের দায়ে করোনা আক্রান্ত হওয়ার ভয়কে তুচ্ছ করে পথে নামবেই। আমি বর্তমান বাস্তবতার দু’একটি চিত্র কাছে থেকে দেখছি বা শুনেছি। আমার বাড়ি নারায়ণগঞ্জের বন্দরে। করোনা আক্রান্ত অঞ্চল। এ অঞ্চলে আমার এক কবি বন্ধু আছেন। তিনি লকডাউন না মানা অবোধ মানুষদের উপর দারুণ ক্ষুব্ধ। প্রায় দিনই বাজার, ব্যাংকের সামনের দৃশ্য এবং রাস্তাঘাটে লকডাউন না মানা মানুষের অবাধ চলাচলের ছবি দিয়ে ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করেন। এদের একটি বড় অংশ জীবন জীবিকার দায়েই পথে নেমেছেন। একটি অংশ আছেন যাদের এইভাবে ঘরবন্দি থাকা আর ভালো লাগছে না বলে পথে বেরুচ্ছেন। আমি সার্বিক অবস্থা বোঝার জন্য বন্ধু-বান্ধব আর পরিচিতজনকে ফোন করলাম। বন্দর শিল্প ও বাণিজ্য অঞ্চল। নানা পেশাজীবীর বাস এখানে। জনসংখ্যা অধ্যুষিত। সঙ্গত কারণেই এখানে বসবাস করা মানুষদের অনেকেই এই নির্বাচনী এলাকার ভোটার নয়। মাঝে মধ্যে পাওয়া ত্রাণও অনেকের জোটে না। পরিচয়পত্রের জোরে অনেক সময়েই অগ্রাধিকার পায় ভোটাররা।

আমি জানলাম বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ কিছুটা হচ্ছে। তবে চাহিদার তুলনায় সামান্যই। জনপ্রতিনিধিরা সাহায্য করছেন। তবে মাসজুড়ে হাজার হাজার পরিবারের ক্ষুধার চাহিদা মেটানো তাদের পক্ষে স্বাভাবিকভাবেই সম্ভব নয়। সরকারি ত্রাণের কথায় আসি। হয়তো একজন কাউন্সিলর তার এলাকায় ত্রাণপাওয়ার যোগ্য ৫০০ পরিবারের জন্য চাহিদাপত্র পাঠিয়েছেন। কিন্তু বরাদ্দ পেয়েছেন ২০০ জনের। তাহলে বাকিরা যাবেন কোথায়! আর যারা পেয়েছেন তা দিয়ে না হয় কায়ক্লেশে এক সপ্তাহ চলবেন। তা হলে বাকি দিনগুলো? 

এ সত্যটি হয়তো বিবেচনায় আছে দিন মজুর এবং বাসা বাড়িতে কাজ করে যারা জীবন নির্বাহ করেন তাদের সংখ্যা এদেশে নিতান্তই কম নয়। এরা অধিকাংশই এখন কর্মহীন। এই শ্রেণির জমানো টাকাও থাকে না আবার রোজগারের বিকল্প উৎসও নগণ্য। ক্ষুধা তো তাদেরও ক্ষমা করে না। একটি সংকটের কথা প্রায়ই বলা হচ্ছে মধ্যবিত্ত বা নিম্নধ্যবিত্ত যারা হোম কোয়ারিন্টন এবং লকডাউনে আটকে আছেন, অর্থ সংগ্রহের উৎসে যেতে পারছেন না। ত্রাণের লাইনেও দাঁড়াতে পারছেন না। ঘরে চাল বাড়ন্ত। এবার এই সংকটে তারা যাবেন কোথায়? এই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। একটি হটলাইনের নম্বর দিয়েছে। বিপন্ন মানুষ ফোন করে সংকটের কথা জানালে বাসায় ত্রাণ পৌঁছে যাবে। আমার জানা মতে চাহিদার তুলনায় এই উদ্যোগের বাস্তবায়ন খুব কম। আবার ঘরবন্দি থাকায় অনেকের কাছে এমন উদ্যোগের কথা জানা নেই। কোনো অঞ্চলে এমন উদ্যোগ গৃহীত হলেও তা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের অনেকেরই তা জানা নেই। এ প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ দেব।

গত ২৮ এপ্রিল রাতে একটি ফোন পেলাম। অপরপ্রান্তে একটি বয়স্ক কণ্ঠ। তিনি একটি সূত্র উল্লেখ করলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের পরিচিত তিনি। এই অধ্যাপক আমার স্নেহভাজন। অধ্যাপক ভদ্রলোককে আমার সাথে কথা বলতে বলেছেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে আমবাগান এলাকায় কিশোরগঞ্জের এই ভদ্রলোক বসবাস করেন। কেন ফোন করেছেন জানতে চাইলে কাঁপা কণ্ঠে শুধু বললেন স্যার খুব কষ্টে আছি। আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না। আমি তাকে আমার বাসার ঠিকানা জানিয়ে পরদিন সকালে আসতে বললাম। আমি নিশ্চিত হওয়ার জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে ফোন দিলাম। জানলাম ওর দেশের মানুষ তিনি। মানুষের কাছে হাত পাতার মত না। দেশে সামান্য জমি জমা আছে। সাভারে ছোটখাট ব্যবসা করে সংসার নির্বাহ করতেন। গত দুদিন তেমন একটা খাবার ঘরে নেই।

পরদিন ষাটোর্ধ ভদ্রলোক এলন। তিন মেয়ে ও এক ছেলেন জনক তিনি। বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন একজন পল্লী চিকিৎসকের সঙ্গে। ওরা গ্রামে থাকে। এখানে তার পাঁচ জনের সংসার। এলাকার বাজারে চায়ের দোকান দিয়ে মোটামুটি সংসার চালিয়ে যাচ্ছিলেন। একমাসের ওপর লকডাউনের কারণে তার দোকান বন্ধ। দেশের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারছেন না। দোকানের যৎসামান্য পুঁজি ভেঙ্গে খাচ্ছিলেন। এখন তাও নিঃশেষ হয়ে গেছে। আমি দীর্ঘশ্বাস বুকে চেপে সামান্য আর্থিক সাহায্য করে বিদায় দিলাম। ভাবলাম এ টাকায় কোনো ক্রমে এক দেড় সপ্তাহ না হয় সামাল দেবেন। অতঃপর?

আমি পাঠকের সামনে ঘটনাটি কিছুটা বিস্তারিত করলাম এজন্য যে একই রকম সংকটের প্রতিচ্ছবি সারা দেশজুড়ে খুঁজে পাওয়া যাবে। আমরা বিশ্বাস করি সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া অধিকাংশ নিরন্ন মানুষের কাছে পৌঁছানো যাবে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিম্ন আয়ের ও সংকটে থাকা মধ্যবিত্তের জন্য রেশন কার্ডের ব্যবস্থা করবেন বলে জানা গেল। এটি খুবই স্বস্তির কথা। তবে পাশাপাশি এই প্রশ্নটি থেকে যায় এই চা দোকানীর মত অসংখ্য মানুষ আছেন যারা ব্যবসা বা কাজ গুটিয়ে ঘরবন্দি আছেন তারাতো মুদ্রার বিচারে কপর্দকহীন। ন্যায্যমূল্যে রেশনের ভোগ্যপণ্য কেনার টাকাই বা পাবেন কোথায় তারা! আবার সমাজ থেকে দুর্বৃত্তদেরও তো তাড়ানো যায়নি। স্বাধীনতার পর নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত রেশনের উপর নির্ভরশীল ছিল। সেইসব দোকানের পণ্যদ্রব্য মেরে দিয়ে ডিলারদের ধনী হওয়ার খবরতো সে যুগে কম রাষ্ট্র হয়নি। আবার করোনা মহামারির মধ্যে ত্রাণের চাল তেল লোপাটের সঙ্গে যুক্ত থাকায় সমাজের অনেক ক্ষমতাবানদের নামও প্রকাশ্যে এসেছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দুর্বৃত্তদের অবস্থান তো আছেই।

এসব বাস্তবতায় আমাদের ভয় সামনের দিনগুলো আরো ভয়ংঙ্কর হবে কিনা কে জানে! সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতার কথা আমরা যতটা ভেবেছিলাম প্রকৃত নিদানে পরে মনে হচ্ছে আমাদের ভাবনা পুরোটা সঠিক নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তরিকতার সঙ্গে সংকট উত্তোরণের নানামুখি পরিকল্পনা করে যাচ্ছেন। এই সংকটে দৃঢ়তার সঙ্গে তার পাশে অনেকের দাঁড়ানো উচিত। সে সহযোগিতা তিনি কতটা পাচ্ছেন আমরা জানি না। যথাযথ পরিকল্পনামত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করতে পারলে মহামারী পরবর্তী দুর্ভিক্ষ এড়ানো কঠিন হবে। দেশবাসীকে রক্ষা করার রাষ্ট্রীয় কর্তব্য যথাযথ পালন করতে হলে চারপাশের ধুতরোফুলগুলোর অপসারণ জরুরি। গোলাপ না হোক চারপাশে অযত্নে বেড়ে ওঠা ভাটফুলও নির্বিষ এবং মনোমুগ্ধকর। এমন মানুষদের মঞ্চে এনে সামাজিক যুদ্ধের আলোকবর্তিকা যদি তাদের হাতে তুলে দেয়া যায় তবে অনেক বেশি সুফল ফলবে বলে আমাদের বিশ্বাস। এই সংকটে আর্তের পাশে দাঁড়াতে হবে সুসংবদ্ধভাবে। এজন্য প্রয়োজন দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। দেশের বিধায়কদের কাছে আজ তেমন দৃষ্টিভঙ্গিই প্রত্যাশা করি।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর