আম্ফানে বিধ্বস্ত লিচু চাষিদের স্বপ্ন!  

আম্ফানে বিধ্বস্ত লিচু চাষিদের স্বপ্ন!  

মাগুরা প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৫৩ ২৯ মে ২০২০  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সুপার সাইক্লোন আম্ফান যেন বিধ্বস্ত করে দিয়ে গেছে মাগুরার লিচু চাষিদের স্বপ্ন। স্বপ্ন ছিল মৌসুম এলেই কাঙ্ক্ষিত দামে  বিক্রি করবেন অতি যত্নের পাকা লিচু। গুনবেন লাভের কাড়িকাড়ি টাকা। কিন্তু চাষিদের সেই স্বপ্ন এখন হতাশার আগুন হয়ে তাদের বুকে জ্বলছে।

মাগুরার লিচুগ্রাম খ্যাত সদর উপজেলার হাজরাপুর, ইছাখাদা, খালিমপুর, মিঠাপুর, হাজিপুরসহ অন্তত ৩৫ গ্রামের লিচু চাষিরা পড়েছেন চরম বিপাকে। আম্ফান তাদের সব স্বপ্ন তছনছ করে দিয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের দাবি, চলতি বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকলেও আম্ফান তাদের ২ কোটি ২৮ লাখ টাকার লিচু বিনষ্ট করেছে। এ ক্ষতি কোনো রকমেই কাটিয়ে সম্ভব নয়।

মাগুরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায় ,চলতি বছরে জেলায় ৫৮০ হেক্টর জমিতে লিচু আবাদ করা হয়। তার মধ্যে সদরে ৪৬৪ হেক্টর, শ্রীপুরে ৮০ হেক্টর, শালিখায় ২০ হেক্টর ও মহম্মদপুরে ২০ হেক্টর জমিতে লিচু আবাদ হয়েছে। যার ৮০ শতাংশ চাষ হয়েছে সদরে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে জেলায় ৫৮ হেক্টর জমির লিচু নষ্ট হয়েছে ।  

এপ্রিলের শেষে ও মে মাসের শুরুতে মাগুরার গাছে গাছে শোভা পায় লাল রঙের পাকা লিচু। মাগুরার উপর দিয়ে ঝিনাইদহ হয়ে যারা চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরসহ বিভিন্ন জেলায় যান। তারা জেলা শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরত্বে ইছাখাদা পৌঁছালেই সড়কের দুই ধারে দেখতে পান সারি সারি লিচু বাগানের এ মনোরম দৃশ্য।

লিচু গ্রামখ্যাত এসব এলাকার দেড় হাজার বাগান থেকে এবার প্রায় ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার লিচু কেনা-বেচা হবে বলে চাষিরা জানিয়েছিলেন। কিন্তু ঝড়ে লিচু বাগানের ক্ষতি হওয়ায় অনেক চাষি পথে বসার উপক্রম হয়েছেন। 

সদর উপজেলার হাজরাপুর, হাজীপুর ও রাঘবদাইড় ইউপির ইছাখাদা, মিঠাপুর, গাঙ্গুলিয়া, খালিমপুর, মির্জাপুর, পাকাকাঞ্চনপুর, বীরপুর, রাউতড়া, বামনপুর, আলমখালী, বেরইল, লক্ষিপুর,  আলাইপুর, নড়িহাটিসহ ৩৫টি গ্রামের চাষিরা গত দুই দশক ধরে বাণিজ্যিকভাবে এই লিচু চাষ করে আসছেন।

লিচু বাগানগুলো ঘুরে দেখা যায়, লিচু ব্যাপারীদের উপস্থিতি খুবই কম। অনেক আগে যেসব ব্যাপারীরা বাগান কিনে ছিলেন শুধু তারা লিচু সংগ্রহ করছেন। 

ঢাকার যাত্রাবাড়ির লিচু ব্যাপারি শেখ রাসেল বলেন, এবার লিচুর চাহিদা কম থাকায় আমাদের সংগ্রহও কম। যানবাহন ও শ্রমিক খরচ বাদে লিচু বিক্রি করে যে অর্থ থাকে তাতে আমাদের লাভ কম। তাই লিচুর ব্যবসা অনেকটা ভাটা পড়েছে ।  

ইছাখাদার লিচু চাষি রাজু বিশ্বাসসহ আরো অনেকে জানান, একসময় এ এলাকার কৃষকরা ধান পাটসহ প্রচলিত ফসল চাষে অভ্যস্ত ছিল। যা থেকে তাদের উৎপাদন খরচ উঠতো না। যে কারণে তারা পেঁপে পেয়ারার পাশাপাশি লিচু চাষ শুরু করে। পরবর্তীতে লিচু চাষ অপেক্ষাকৃত লাভজনক হওয়ায় গোটা এলাকার কৃষকরা লিচু চাষ শুরু করে। বর্তমানে হাজরাপুর, হাজিপুর, রাঘব দাইড় এ তিন ইউপির ৩৫ গ্রামের কৃষকরা শুধু লিচুর চাষ করছে।

কিন্ত এবার ঝড়ের প্রভাবের কারণে তারা বিপাকে পড়েছেন । তার নিজের ১৫টি বাগান ছিল। গত বছর এ বাগান থেকে ৬০-৭০ লাখ টাকার লিচু বিক্রি হয়েছিল। কিন্তু এবার লিচু ব্যাপারিরা না আসায় তাদের ব্যবসায় ভাটা পড়েছে। প্রতিদিন বাগানে ১২-১৪ জন শ্রমিক লিচু সংগ্রহের কাজ করে। প্রত্যেককে ৪০০-৫০০ টাকা দিতে হয়। তাই এবার লাভ তো দূরের কথা পুঁজি বাঁচানোয় কষ্ট ।

আলাইপুর গ্রামের লিচু চাষি সিদ্দিক হোসেন জানান, ৬৫০ টি গাছ নিয়ে তার একটি বড় লিচু বাগান রয়েছে। গত বছর যা ১৫ লাখেরও বেশি টাকায় বিক্রি হয়েছিল। এবার বিক্রি হয়েছে ৬-৭ লক্ষ। এবার ঝড়ে ৪০ শতাংশ লিচু গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । 

মাগুরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক জাহিদুল আমিন বলেন, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় জেলায় লিচু চাষ ভালো হয়েছে। জেলার প্রায় ৮০ শতাংশ লিচুর চাষ হয়েছে সদর উপজেলায়। আমরা লিচুর ফুল আসার সঙ্গে সঙ্গে লিচু চাষিদের নানা পরামর্শ  ও প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করেছি।

পাশাপাশি লিচু পরিচর্যার নানাবিধ পরামর্শ দিয়েছি চাষিদের। গোটা জেলায় প্রায় দেড় হাজার লিচু বাগান রয়েছে। যেখানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে লিচু চাষ করে হাজারো কৃষক পরিবার আত্মনির্ভরতার পথ খুঁজে পেয়েছেন। কৃষি বিভাগ অব্যাহতভাবে নিয়মিত খোঁজ খবর নেয়ার পাশাপাশি সব ধরনের সুবিধা এসব চাষিদের দিচ্ছে। এবার ঝড়ে লিচু গাছের কিছু অংশ ক্ষতি হয়েছে। তবে লিচুর ভালো দাম পেলে চাষিরা উপকৃত হবেন।  
                                                 
 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ