Alexa আমি কাঁদতে আসিনি, এসেছি মুক্তির দাবি নিয়ে

আমি কাঁদতে আসিনি, এসেছি মুক্তির দাবি নিয়ে

প্রকাশিত: ১৫:৪৮ ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৫:৫২ ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯

নাট্য প্রশিক্ষক ড. বিপ্লব বালা জন্ম দিয়েছেন শীর্ষ আবৃত্তির সংগঠন কণ্ঠশীলনের। রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাট্যকলায় অনার্স, মাস্টার্স ও পিএচডি ডিগ্রি লাভ করে দেশের জন্যই সমর্পণ করেছেন নিজেকে। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং নানা গ্রæপ থিয়েটারে নাট্যপ্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। 

সমাজে শিল্পীর একটা বিশেষ কাজ আছে, ভিন্ন এক ভূমিকা তার। নানা মাধ্যমে শিল্পীসুজন মানুষকে তার স্বার্থের জৈব প্রয়োজন থেকে মুক্তি দেয়। দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতায় আমরা তো নানা স্বভাববিরুদ্ধ ক্রিয়াকার্য বাধ্যত করে থাকি। অথচ তা করে আমরা কেউ-ই ঠিক ভালো থাকি না। তার থেকে মনের এক সহজ আনন্দ পেতে উদগ্রীব থাকি ভেতরে ভেতরে। 

শিল্পে আমরা রজ-তমের লাভলোভ থেকে সত্ত্ব-সত্তা লাভ করি। ছোট আমির থেকে বড় আমির নাগাল পাই। তখন আর কোনো ভয় থাকে না মনে। রাষ্ট্র-দেশ-সমাজের ক্ষমতার মুখে রক্ষা করতে পারি মানবস্বভাব। বিশেষ করে রাজনৈতিক কারণে যখন শাসক মরিয়া হয়ে ওঠে, সাধারণের কোনো প্রতিবাদে সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। ভয়গ্রস্থ মানুষকে অভয় দেয় তখন শিল্পনন্দন। গ্রামসমাজে শিল্পীসাধক চিরকালই ছিল অকুতোভয়, অভীক। গানে-গানে কবিতায়, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র মাধ্যমে শিল্পী জুগিয়ে দেয় সে মারণজয়ী শক্তিসাহস। ব্রিটিশ আমল থেকে তা আমরা দেখে আসছি। বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলনেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। ‘আমি কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’- ভাষা শহীদের স্মরণে প্রথম উচ্চারিত হয় এ কবিতা। গানে গানে তার স¤প্রসারণ ঘটে- ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’, বা সবশেষে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ ভাষা দিয়েছিল আবেগ ও প্রতিবাদের। চিত্রশিল্পীরা পোস্টারে, দেয়ালচিত্রে রূপ দেন দৃশ্যময় বরাভয়। কবি-লেখক লিখে চলেন লাগাতার; মুনীর চৌধুরী জেলখানায় বসে লেখেন ‘কবর’, সেখানেই হ্যারিকেনের আলোয় তা অভিনীত হয়। জহির রায়হান ‘জীবন থেকে নেয়া’য় একুশে থেকে উনসত্তরের গণআন্দোলন চলচ্চিত্র রূপায়ণ করেন। ‘ছায়ানট’-এর বর্ষবরণ প্রবর্তন রমনার বটমূলে; বা রবীন্দ্রবর্জনের প্রতিবাদে তাকেই করে তোলেন বাঙালির মানসমুক্তির সর্বাধিনায়ক। বঙ্গবন্ধু ষাটের দশক থেকে সভা শেষে বা শুরুতে গেয়ে উঠতে অনুরোধ করেন ছায়ানট বা সন্জীদা খাতুনকে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’ বোঝা যায় বাস্তব মুক্তিযুদ্ধের জমিন তৈরি হয় এভাবেইÑ গানে গানে, কবিতায়, গল্পে,  নাটক ও চলচ্চিত্রে।

যদিও এতই একনিষ্ঠ ছিল না সে প্রণোদনা। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে লেখক সমাজের বড় অংশই পাকিস্তানি পুরস্কারের লাগাতার লাভলোভের শিকার হন। স্বাধিকার আন্দোলন থেকে গা-বাঁচিয়ে নিরাপদ দূরত্বে থেকেছেন। তাই তো বঙ্গবন্ধু উনসত্তরে তাকে প্রদত্ত লেখক সমাজ কর্তৃক সংবর্ধনায় যেতে চাননি, নানাভাবে সাধ্য সাধনা করে তাকে আনা হয়েছিল। সেখানেও তিনি লেখককুলের হেন দুই নম্বরী দ্বিচারিতায় ধিক্কার দেন- যখন কিনা মানুষ গণঅভ্যুত্থানে জীবন দিচ্ছে, অত্যাচার সইছে।

তাই দেখি, অসহযোগ আন্দোলনকালে গঠিত হয় ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’- তারাও দোহার হয়ে ওঠে লাগাতার সে জাগরণের। এই ধারা স্বাধিকার আন্দোলন পর্যন্তই অটুট একনিষ্ঠ ছিল।

মুক্তিযুদ্ধকালে শরণার্থী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সঙ্গে শিল্প-সংস্কৃতির মানুষও দেশ ছাড়ে। পথে গ্রামবাংলার চিরকালের মানব সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে এই প্রথম ঘটে তাদের অভিনব এক অভিরাম সাক্ষাৎ। শহরে বসে তার নাগাল কোনো দূর অনুমানেও পায়নি তারা। তাতে করে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে নতুন এক দেশ-সমাজ গঠনের আবেগ জাগে। মানুষের প্রতি আভ‚মি কৃতজ্ঞতার ঋণ শোধ করার দায়বোধ সঞ্চার হয় শিল্প-সংস্কৃতিজনের মনের সংবেদনে। এমন এক মথিত ভবিষ্যৎকল্পনা ভর করে তারা অর্জন করে যুদ্ধকালের চেতাবনি। কলকাতা-আগরতলা পৌঁছে প্রবাসী সরকার গঠনের পাশাপাশি গঠিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যুক্ত হয় শিল্পীসুজনরা। 

‘মুক্তিযুদ্ধ সহায়ক সমিতি’ গানে-গানে বিদেশি জনমত গঠনের লাগাতার অনুষ্ঠান আয়োজন করে চলে কলকাতা-দিল্লি-আগরতলায়। শরণার্থী ক্যাম্পে ক্যাম্পে গান-নাটক-পুতুলনাচ-কথকতায় উন্মোথিত করতে থাকে পারস্পরিক মনোবল। জহির রায়হান-আলমগীর কবির ক্যামেরায় ধারণ করতে থাকেন মুক্তিযুদ্ধ চলচ্চিত্রাবলি ‘স্টপ জোনোসাইড’, ‘বার্থ এফ এ নেসন’। লেখক-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীকুল পত্রিকায়, সমাবেশে উদাত্ত ব্যাখ্যান করেন স্বাধীন বাংলার মর্মন্তুদ পরিস্থিতি। আমেরিকার কবি গিনসবার্গ বিশ্বমানবের গোচরে আনেন যশোর রোড অতিক্রম্য মানব দুর্ভাগ্যগাথা। আমেরিকায় পণ্ডিত রবিশংকর আর জর্জ হ্যারিসন আয়োজন করেন- ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেকষ্ফ বিশ্বজনমত গঠনকল্পে। একটি ট্রাকে করে শিল্পীসুজন গানে গানে চারণ করে বেড়ান শরণার্থী ক্যাম্পে ক্যাম্পে। সবার অলক্ষ্যে তাতে সওয়ার হয় এক অমেরিকান তরুণ- লিয়ের লেভিন ক্যামেরা হাতে। কয়েক হাজার ফুটেজ ধারণ করেন তিনি। এমন নান্দনিক অভিযান লোকচক্ষুর আড়ালেই ছিল, যুদ্ধপরবর্তী লেভিনের বাকসপেটরার গুদামে। দুই যুগ ধরে অবহেলায় অগোচরে পড়েছিল সে অমূল্য সম্পদ, হারানিধি প্রায়। কী করে তার অকস্মাৎ খোঁজ পেয়ে তারেক মাসুদ উদ্ধার করেন রাক্ষসপুরে ঘুমন্ত সে রাজকন্যায়। 

বছর কয়েকের একনিষ্ঠব্রতে চলচ্চিত্র রূপায়ণ ঘটে তার- ‘মুক্তির গান’। মুক্তিযুদ্ধ বিনাশকালের অন্তঃপর্বে তা হয়ে ওঠে কালঘুম থেকে জেগে ওঠা জিয়নকাঠি- যেন সোনারকাঠির জাদুর ছোঁয়ায়। তাতেই সম্ভব হয় দ্বিতীয় এক মুক্তিযুদ্ধের সূচনা- ‘গণজাগরণ মঞ্চ’। বাংলায় হাজার রূপের হাজার রাক্ষসের বহুছল, আর ক্ষমতার হরেক কৌশলে তার আপাত পরাভব ঘটলেও- এই বীজতলা থেকেই উদগম হবে আরেকবার দুর্মর সে বিস্মৃত, অপহৃত প্রাণকণা, বাঙালির প্রাণভোমরা। মুক্তিযুদ্ধকালেই রোপিত হয়েছিল নতুন দেশ-সমাজ অর্জনের যে শিল্পসাংস্কৃতিক বীজতলা, স্বাধীনতার পরে সে ধারা বইতে পারেনি লেখকশিল্পী সমাজ। লোভের লাভের চোরাবালিতে খোয়া গেছে অর্জিত যত ধন। পাকিস্তান আমলজুড়ে নানা স্থলন-পতন সত্ত্বেও যতটা যা কিছু সম্পন্ন করা হয়েছিল তার যথা প্রয়োগ বড় অসম্পন্ন রয়ে গেছে। তার ফলেই তো ঘটেছে ১৫ আগস্ট, জঙ্গি-জামায়াত-হেফাজতি উত্থান- মনের মধ্যে ঘটে গেছে যেন এক পাকিস্তানি সংক্রমণ- যার হাত থেকে রেহাই পায়নি কোনো মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তিও। তারই পরিণাম আজকের এই আতঙ্কভয়গ্রস্ত মনন-মনের কঠিন বাস্তব। কোথাও যেন সর্বনাশ হয়ে গেছে রাষ্ট্র-দেশ-সমাজ-দলের যা কিছু ছিল মানবসম্বল। পাওয়া ধন খোয়ানোর এই কি চিরকালের নিয়তি বাঙালির!

‘কে জাগিবে আজ, কে করিবে কাজ
কে ঘোচাতে চাহে জননীর লাজ।’

কে আছ শিল্পীসুজন, জাগো বাহে কণ্ঠে সবাই।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর