আমার দেখা মালদ্বীপ: সবার মুখে বাংলা শুনে চক্ষু চড়কগাছ!

পর্ব- ২

আমার দেখা মালদ্বীপ: সবার মুখে বাংলা শুনে চক্ষু চড়কগাছ!

সাবিহা সুলতানা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৪৫ ৩১ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৫:০৭ ৩১ জানুয়ারি ২০২০

মালদ্বীপে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে প্রায়ই

মালদ্বীপে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে প্রায়ই

এমন এক নির্জন আইল্যান্ডেই যেতে চেয়েছিলাম আমরা। যেখানে থাকবে না কোনো শহুরে কোলাহল কিংবা জীবন যুদ্ধের তাগিদ। সেখানে থাকবো শুধুই আমরা, একান্তে। সামনে শুধু বিশাল, বিস্তীর্ণ নীল সাগর। কিন্তু আজ যখন স্বপ্নের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছি প্রায় তখন এমন বুক ঢিপ ঢিপ কেন? হঠাৎ কানে ফিস ফিস শব্দে চমকে উঠলাম আমি। সব ভয় উধাও, মুখে হাসি। শক্ত করে দুই হাতে ধরে রাখলাম বাকি দুজনের হাত। কেন? কারণ আমার পতিদেব তখন আমার কানে কানে আবৃত্তি করে চলেছেন হাজার বার আওড়ানো আমার অসম্ভব প্রিয় একটি কবিতা-

আমরা যাব যেথায় কোন
যায়নি নেয়ে সাহস করি।
ডুবি যদি তো ডুবি-না কেন
ডুবুক সবি, ডুবুক তরী।

সুনীল সাগরের বুকে ভাসতে ভাসতে প্রেমিকের হাতে হাত রেখে কবিগুরুর কবিতা, আর অন্য আর এক হাতে মুষ্ঠিবদ্ধ কন্যার কোমল হাত। এ ধরাতে স্বর্গ এনে নামাতে আর কী লাগে এই জীবনে?

গুরাইধো আইল্যান্ড

দীগন্ত রেখায় লালিমা ছড়িয়ে সূর্য তখন কেবল পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছে। ঠিক এমনই এক কনে দেখা আলোয় আমরা আমাদের চরণযুগল রাখলাম গুরাইধো নামক ভারত মহাসাগরের বুকে ভেসে থাকা ছোট্ট সেই আইল্যান্ডে। পড়ন্ত বেলার সোনালী আলোয় গাঢ় নীল সাগরের বুকে শুভ্র বালুকা আর ছোট ছোট সবুজ গুল্মে ছাওয়া ছোট্ট এ দ্বীপটি যেন অন্য এক জগতের দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়ে দিলো আমাদের। আমাদের রেস্ট হাউজটি ফেরি ঘাট থেকে কয়েক কদম দূরে মাত্র, একদম সাগরের কোল ঘেঁষেই। রুমে পৌঁছে কোনোরকম ব্যাগটা রেখেই আমরা এক দৌঁড়ে সাগর তীরে। সূর্য ততক্ষণে আরেকটু ঢলে গিয়েছে, তাই সেই আবছায়া আলো-আধারিতে দ্বীপটিকে আরো বেশি রহস্যময় বলে মনে হচ্ছিল আমাদের কাছে। সামনে যতদূর চোখ যায় দীগন্ত বিস্তৃত নীল সমুদ্র যেন তার বুকে জেগে থাকা এক খণ্ড মাটিতে পরম স্নেহে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে আমাদের।

হোটেলে ফিরে এসে আরেক চমক। রেস্ট হাউজের ম্যানেজারও বাংলাদেশি! এমন প্রত্যন্ত দ্বীপেও যে আমরা দেশি মানুষের দেখা পাবো, তা ভাবিনি। তার মুখে শুনলাম রেস্ট হাউজে আমরাই প্রথম বাংলাদেশি সেখানে উঠেছি। তার সঙ্গে খানিকটা গল্প করে আবার বের হলাম আমরা আশেপাশে ঘুরে দেখতে। আর ঠিক তারপরেই আমাদের গল্পটি যে নিছক এক ভ্রমণ কাহিনী থেকে বের হয়ে এসে অন্য আর একটি গল্পে মোড় নিবে তা কে জানতো?

দু-পাশে রঙ-বেরঙের পতাকায় সজ্জিত

সাগর কোল ঘেঁষে হাঁটছি আমরা। কংক্রিটে বাঁধানো চমৎকার পথ, দু-পাশে রঙ-বেরঙের পতাকায় সজ্জিত। স্ট্রিট লাইটের আলোয় উজ্জ্বল চারপাশ। আশেপাশে জনমানব খুব কম। একটু ভেতরে স্থানীয়দের ঘরবাড়ি। আরেকটু এগোতেই চোখ আটকালো একটা দৃশ্য- সাগর তীরে বেশ কয়েকজন মানুষ বিভিন্ন রকম হালকা খাবারের পশরা নিয়ে বসেছে। হাঁটতে হাঁটতে তাদের কাছে আসতেই তাদের সবার মুখে বাংলা ভাষা শুনে তো চক্ষু চড়কগাছ আমাদের। একি! এতো বাঙালী আসলো কোথা থেকে? কন্যার আবদারে সাড়া দিয়ে ডাব কিনতে গেলাম। যিনি বিক্রি করছিলেন তাকে দেখে তো অবাক আমরা। প্রায় ছয় ফুটের অধিক উচ্চতার বলিউডের নায়কদের মতো দেখতে অত্যন্ত সুদর্শন একজন তরুণ ডাব বিক্রি করছিলেন সেখানে। ডাব দিতে বলে আমরা বসলাম সৈকতের কোলে বানিয়ে রাখা সিমেন্টের চেয়ারে। সেই ভদ্রলোকও দেখি নিজেদের মধ্যে বাংলায় কথা বলছে। এমন নির্জন দ্বীপে এত বাংলা ভাষাভাষী দেখে আমরা আর পারলাম না। গল্প জুড়ে দিলাম, পরিচিত হতে লাগলাম সবার সঙ্গে। একি! এরা সবাই যে বাংলাদেশি!

আমাদের পরিচয় পেয়ে তারাও অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে এগিয়ে এল। অতঃপর তার কিছুক্ষণ পর দেখা গেল মাঝখানে চেয়ার নিয়ে আমরা তিনজন মধ্যমণি; আর আমাদের চারপাশে দশ-পনের জন দেশি মানুষ। তাদের কেউ হয়তো খাবার বিক্রি করেন, কেউ বিভিন্ন রিসোর্টে চাকুরি করেন, কেউবা নিজেই ব্যবসা করছেন এখানে। প্রত্যেকেরই গল্প ভিন্ন, ভিন্ন তাদের দেশে ফেলে আসা অতীত। কিন্তু একটি জায়গায় তারা সবাই এক হয়ে গেছেন; তা হল- তারা সবাই হাজার হাজার মাইল দূরের প্রিয় মাতৃভূমিটিকে ছেড়ে এসে সাগরের বুকে ভেসে থাকা ৬৭৫ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৫০০ মিটার প্রস্থের ক্ষুদ্র এ দ্বীপটিতে এসে আশ্রয় নিয়েছেন জীবিকার তাগিদে। তাদের সবারই বুকে দেশ ও প্রিয়জনের জন্য হাহাকার আর চোখের সামনে আদিগন্ত বিস্তৃত সাগর যার গাঢ় নীল রঙ যেন তাদের বুকের চাপা কষ্টের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে কোথাও।

গুরাইধো আইল্যান্ড

তাদের চোখে জল আর আমার মেয়ের হাত ভরে ওঠে নানা রকম উপহারে। আমরা লজ্জায় পড়ে যাই বারবার। কিন্তু না, তারা কোনো কথাই শুনবেনা। আগামীকাল আবার আসবো কথা দিয়ে এক বুক ভালোলাগা নিয়ে সেদিনের মত চলে আসলাম আমরা। রেস্ট হাউজে ফিরে ডিনার করব এটা জানাতেই বাংলাদেশি ওই ম্যানেজার আমাদের নিজেই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে একটি ভালো রেস্টুরেন্টে পৌঁছে দিলেন। তার মতে- ‘অযথা বেশি টাকা খরচ করে এ রেস্ট হাউজে কেন খাবেন? তার চেয়ে এখানে খান, দাম কম কিন্তু খাবার বেশ স্বাদের।’ শুধুমাত্র বাংলাদেশি পরিচয় পেয়েই সে নিজের রেস্ট হাউজ বাদ দিয়ে অন্য রেস্টুরেন্টে খাওয়ার পরামর্শ দিলেন। বলাই বাহুল্য সেই রেস্টুরেন্টেও গাজীপুরের এক স্মার্ট তরুণের সঙ্গে পরিচয় হলো আমাদের। পরিচয় আগেই পেয়ে গিয়েছেন অন্যদের সঙ্গে গল্প করতে দেখে। অতঃপর খাবারের সঙ্গে কমপ্লিমেন্টারি হিসেবে জুস এবং চিপস ফ্রি পেলাম; খাবারটাও স্পেশাল ভাবে বানিয়ে দিলো। ফিরে এসে সোজা বিছানায়। গল্প এখানেই শেষ নয়, চলবে...।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে