আমার দেখা মালদ্বীপ: নীল সাগরের উপাখ্যান

পর্ব- ১

আমার দেখা মালদ্বীপ: নীল সাগরের উপাখ্যান

সাবিহা সুলতানা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:৫৪ ৩০ জানুয়ারি ২০২০  

গুলহি আইল্যান্ড

গুলহি আইল্যান্ড

মালদ্বীপ, নামটির সঙ্গে কম-বেশি সবাই পরিচিত। নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে উঠে স্ফটিক স্বচ্ছ নীলাভ জলরাশি আর তার বুকে জেগে থাকা শ্বেত-শুভ্র বালুকা-নারিকেল বিথিকাপুর্ণ এক একটি ক্ষুদ্র দ্বীপপুঞ্জ। নীল-সাদার এমন অপূর্ব কাব্যে কার না হারায় মন?

একটু সাহস করে ঠিক করলাম বাকেট লিস্টের অন্যতম লোভনীয় স্থান মালদ্বীপ যাব। কিন্তু যা বুঝলাম ঢাকা থেকে সরসারি গেলে যে খরচ তাতে আমাদের দেউলিয়া সম্ভাবনা রয়েছে! কিন্তু আমরা যদি ভারত দিয়ে ভেঙে-ভেঙে যাই তাতে খরচ কিছুটা হলেও কমবে। এখন কথা হল, মালদ্বীপ গেলে তো শ্রীলংকার উপর দিয়ে যেতে হয়; তাহলে কি দুটি দেশই দেখব? আমরা সাধারণত একসঙ্গে দুই দেশে দেখার পক্ষপাতী না কারণ এতে দেখা যায় তাতে সময়স্বল্পতার কারণে দেশগুলোতে শুধু পদধূলিই দেয়া হয়, দেখা আর হয়না কিছুই।

বিভিন্ন অনলাইন ঘেঁটে জানতে পারলাম- খরচ বেশি হওয়ার কারণে মালদ্বীপে পর্যটকরা সাধারণত দু-তিনদিন থাকেন। এক-দুই রাত মালে অথবা হুলহুমালেতে আর এক রাত থাকে রিসোর্ট আইল্যান্ডগুলোতে। এখন আমরা কী করব? আমরাও কি অন্যদের মতো এক রাত রিসোর্ট আইল্যান্ডে আর বাকি রাত রাজধানীতে থেকে চলে আসব? আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ‘না’! কারণ বিলাসবহুল রিসোর্ট আইল্যান্ডে এক রাতে ৫০/৬০ হাজার টাকা খরচ করার চেয়ে বিভিন্ন লোকাল আইল্যান্ডে পাঁচ রাত থাকাটাই অনেক বেশি অ্যাডভেঞ্চারাস বলে মনে হলো।

বিমান দেখে দেখা নীল সাগরের উপাখ্যান

সবশেষে আমাদের প্ল্যানটি ছিল এরকম- পুরো দশ দিনের ট্যুর। পাঁচ দিন মালদ্বীপ, তিন দিন শ্রীলংকা, যাওয়ার পথে একরাত কলকাতা (কারণ চেন্নাইয়ের ফ্লাইট পরদিন সকালে) এবং আসার পথে একরাত কলকাতা। যাই হোক, আমরা দেড় মাস আগে টিকিট কেটে ফেললাম। বেছে বেছে অফ-টাইমগুলোতে টিকেট কাটলাম যাতে খরচ কম হয়।

আমাদের প্রথম রুট ঢাকা টু কলকাতা। শুধু রাতটা কলকাতা থেকে পরদিন ভোরে চেন্নাই; সেখান থেকে মালদ্বীপ। মাঝখানে ট্রানজিট শ্রীলংকার কলম্বোতে। ফেরার পথে মালে টু কলম্বোতে এসে তিন দিন থেকে তারপর কলকাতায়। সেখানে একরাত দুইদিন থেকে ঢাকায় ফিরবো। সব প্ল্যান ঠিক করে অপেক্ষা করতে লাগলাম বিশেষ দিনটির! অবশেষে ১৪ রওনা দিলাম। তার পরদিন সন্ধ্যা ৭ টায় আমাদের নিয়ে লংকান এয়ারলাইন্স-এর এয়ারবাসটি স্পর্শ করল হুলহুমালে আইল্যান্ডের ভূমি। আর সেই সঙ্গে নীল সাগরের ঘ্রাণ মাখা তাজা হাওয়ার আবেশ মেখে আমরাও প্রথম পদচিহ্ন রাখলাম মালদ্বীপের মাটিতে।

ভেলেনা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট একদম সাগরের তীর ঘেঁসে। কিন্তু আমরা যখন প্লেন থেকে নামলাম ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। অন অ্যারাইভাল ভিসা কয়েক মিনিটেই হয়ে গেল। আমরা প্রথম রাত থাকবো রাজধানী মালেতে। এয়ারপোর্ট থেকে পিক করতে হাজির হোটেলের প্রতিনিধি। হুলহুমালে থেকে মালে যেতে হয় সাগর পথে, দশ মিনিটের ফেরি রাইড। ওরাই আমাদের ফেরিতে তুলে দিলো। তারপর মালেতে পৌঁছে একটা প্রাইভেট কারে আমাদের হোটেল সমারসেট ইন-এ নিয়ে গেল তারা। ততক্ষণে রাত হয়ে গেছে। কে বলবে সাগরের বুকে ভেসে থাকা ছোট্ট এক আইল্যান্ড মালে? সারা রাস্তাজুড়ে শুধু বাইক আর স্কুটির ছড়াছড়ি।

গাড়ি থেকে নামতেই সুদর্শন এক যুবক এগিয়ে এলো। হঠাৎ কানে ভেসে এল খুব পরিচিত একটি ভাষা, ‘আপনারা আসুন, ব্যাগ আমরা পরে নিয়ে আসছি।’ বিদেশ বিভুইয়ে বাংলা আসলো কোথা থেকে? কথা বলে বুঝলাম ছেলাটা বাংলাদেশি। এরপর যেখানেই গিয়েছি আমরা সেখানেই মালদ্বীপের নাগরিকের চেয়ে বাংলাদেশিদের সঙ্গেই বেশি দেখা হয়েছে আমাদের। সে গল্পে পরে আসছি এ লেখার দ্বিতীয় পর্বে।

নীল সাগরের দেশের সৈকত

হোটেলেই রাতে খাবো কি-না জিজ্ঞেস করতেই বাংলাদেশি ছেলেটি আমাদেরকে একটি দেশি রেস্টুরেন্টের ঠিকানা দিলো। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে রাত দশটার দিকে আমরা বের হলাম দেশি খাবারের সন্ধানে। একটু এগোতেই দেখা মিললো ‘ঢাকা ফুড’ নামের সেই রেস্টুরেন্টের; ঢুকেই মনে হলো দেশের কোনো রেস্টুরেন্টে আছি আমরা। কাস্টমার এবং মালিক সবাই প্রবাসী বাংলাদেশি। একমাত্র আমরাই ট্যুরিস্ট ওখানে। খাবারের দামও অনেক কম। রুই মাছ, চিকেন আর নানা রকম ভর্তা দিয়ে খেয়ে ফিরে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন আমরা।

ছোট্ট শহর মালে। ফেরি ঘাট আমাদের হোটেল থেকে হাঁটা পথ, তাই পদব্রজেই বেরিয়ে পরলাম আমরা থ্রি মাস্কেটিয়ার্স। আর সেই প্রথম দিনের আলোয় নীল সাগরের সঙ্গে চাক্ষুস সাক্ষাৎ হলো আমাদের। চলে গেলাম আর্টিফিসিয়াল বিচে। এখান থেকেই মালে এবং হুলহুমালের মাঝে সংযোগকারী সমুদ্রের উপর দিয়ে নির্মানাধীন ব্রিজটির খুব কাছে যাওয়া যায়। সেখানে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে একটা ট্যাক্সি নিয়ে চলে গেলাম ইসলামিক সেন্টারে। এখানে গেলে অসংখ্য কবুতর দেখতে পাবেন। এখানেও কিছু সময় কাটিয়ে ফিরে এলাম হোটেলে। আবার সেই রেষ্টুরেন্টে লাঞ্চ করে চেক আউট করে চলে এলাম ফেরিঘাটে।

ঘড়ির কাঁটা যখন ঠিক তিনটা, তখনই আমাদের নিয়ে নীল সাগরের বুকে গা ভাসালো ফেরি। গোটা ফেরিতে যাত্রী খুব বেশি নেই। কয়েকজন স্থানীয় মানুষ আর বিদেশি পর্যটক। যা বুঝলাম টিকেট আগে না কাটলেও চলতো আমাদের। এবার যথার্থই সমুদ্র ভ্রমণ শুরু হল। নীল সাগরের বুক চিরে চলছে আমাদের ফেরি। চমৎকার একটি রাইড। দেড় ঘণ্টা পর ফেরি প্রথম পৌঁছে গেল গুলহি আইল্যান্ডে।

ছোট্ট ছবির মতো সুন্দর একটি আইল্যান্ড গুলহি। কিন্তু শুক্রবারে কোনো ফেরি নেই বলে আমরা ফেরার পথে এখানে আসতে পারবো না। এ আইল্যান্ড একটি গ্রেট মিস আমাদের জন্য। সেখানে দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যে যাত্রী ওঠানামা করে যাত্রা শুরু করে, এরপর আধাঘণ্টা পরে মাফুশী আইল্যান্ড। এখানে আমরা ফেরার পথে নামবো। এখান থেকে যাত্রী নামানোর পর যখন আমরা গুরাইধোরের পথে যাত্রা করলাম তখন পুরো ফেরিতে স্টাফ ছাড়া আমরা তিনজন আর একজন সাদা চামড়ার ট্যুরিস্ট! বুক ছমছম আমার, এ কোন নির্জন দ্বীপে যাচ্ছি আমরা? অ্যাডভেঞ্চার করতে গিয়ে কি একটু বেশি সাহস দেখিয়ে ফেললাম নাকি? বাকি গল্পটা আগামীকাল।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে