আমার ইনবক্স থেকে নীলার গল্প ।। রেজা কামাল

আমার ইনবক্স থেকে নীলার গল্প ।। রেজা কামাল

গল্প ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৩২ ২৬ জুলাই ২০২০  

ছবি: ইন্টারনেট

ছবি: ইন্টারনেট

ইদানীং ফেসবুক বন্ধুদের সঙ্গে আলাপচারিতার সময়ে মাঝেমধ্যেই তালগোল হারাচ্ছি। কী থেকে কী সব বুঝি, নাকি আমিই বেশি বুঝি, সেটাই বুঝি না। লেখালেখি শুরুর পর থেকেই ইনবক্সে চেনা অচেনা বন্ধুদের ভিড় বেড়েছে। বেড়েছে নানান অভিজ্ঞতাও। এসব অভিজ্ঞতা নিয়ে আমি যতটুকু সমৃদ্ধ হচ্ছি নীলা ততটুকুই মজা নিচ্ছে।

নীলা হলো আমার গার্লফ্রেন্ড। আমার ইনবক্সের সবকিছু তার পড়া চাই। তাই দেখা হওয়া মাত্রই সে কেড়ে নেয় আমার মোবাইল। তারপর পুরনোগুলোসহ ইনবক্সের সব বার্তা পড়া হলে তবে তার থামা। তার আগে টু-শব্দটুকুও নয়। এ নিয়ে অভিযোগ করলে সে জোর করে আমার পাসওয়ার্ড আদায় করে নিয়েছে। পাসওয়ার্ড আদায় করে নেয়ার পর থেকে তার নিজের ডিভাইসে সারাক্ষণ আমার আইডিতে ডুবে থাকে। তাতে সমস্যার নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। তার কাছে আমার কৈফিয়ত দেয়ার হার বেড়েছে। কোনো মেয়ে আইডি হতে শুভ সকাল জাতীয় বার্তা এলেও তার কারণ ব্যাখ্যার আগে আমার নিস্তার নেই। এভাবে এটা সেটার ব্যাখ্যা করে সারাদিন যে ব্যস্ততায় আমার দিন যায় তাতে লেখালেখির বারটা বেজেছে। এই যেমন, একটি পত্রিকার সাহিত্য পাতায় আমার একটি লেখা দেয়ার কথা আছে। কিন্তু লিখতে পারছি না। অথচ কাল দুপুরের ভেতর লেখা পাঠানোর শিডিউল দিয়ে রেখেছি। শিডিউল দিয়ে রাখলেই লাভ কী? নীলার যন্ত্রণায় গল্প লেখার সময় পেলাম কই! ভেবেছিলাম আজ রাত যে করেই হউক লিখবো। কিন্তু রাত ন’টা বাজতেই নীলার আবদার, তার সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলতে হবে। গল্প লিখার তাগিদ জানার পরেও সে আমায় ছাড়েনি। সে পুরো দুই ঘণ্টা খেয়ে নিল। লাভের লাভ শুধু ইনিয়ে-বিনিয়ে যত সব বকবকানি। বরঞ্চ, তাতে বেড়েছে সময় স্বল্পতার বিপরীতে টেনশন। বেশি টেনশনে লেখা যায় না। তাই টেনশনকে জমিয়ে রেখে ঘুমিয়ে গেলাম। সকালে ঘুম ভাঙার পর নিজেকে অপরাধী লাগছে। সম্পাদক সাহেবকে কথা দিয়ে কথা রাখতে পারলাম না। সে নিয়ে প্রেমকে দায়ী করা ছাড়া উপায় কী? রাগে প্রেমের প্রতি অভিমান হচ্ছে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, আজ নীলার সঙ্গে কথা বলবো না। তাই ফোনটা অফ করে দিয়ে ল্যাপটপ অন করলাম। নোটিফিকেশন অন থাকায় ব্রাউজার নতুন ই-মেইল আসার বার্তা দিল। ঢুকেই দেখি নীলার মেইল। বিরক্তি তাতে আর এক ধাপ বাড়লো। আমি বুঝতে পারলাম, আমি যতই এড়াতে চাই না কেন, নীলা আমাকে আষ্টেপিষ্টে বেঁধে ফেলেছে। এজন্যই লোকে গায়, ‘পিরিতি কাঁঠালের আঠা, ও আঠা লাগলে পরে ছাড়েনা।’

চার লাইনের ছোট একটি ই-মেইল পেলাম। সঙ্গে একটি ফাইল সংযুক্ত। মেইলের সূচনা দেখেই মেজাজটা বিগড়ে গেল।

‘আব্বু, ঘুম ভেঙ্গেছে? জানি, আমার যন্ত্রণায় তোমার গল্প লিখা হয়নি। তোমার ইনবক্স হতে কিছু ভালোলাগার বার্তা কোট করে তাতে নিজের বয়ান যুক্ত করেছি। চাইলে এটাকেই নিজের গল্প বলে চালিয়ে দিতে পার।’
ইতি, তোমার নীলা।

আমার এক বন্ধুর প্রেমিকা তাকে আব্বু বলে ডাকে। ফোনের সময় কথায় কথায় প্রেমিকার মুখে আব্বু আব্বু ডাক নাকি নেশা জাগায়। তা জানার পর থেকেই নীলাও আমাকে ইন্টারনেট ভিত্তিক সকল আলোচনায় আব্বু বলে ডাকে। তবে আব্বু বা প্রিয় যাই ডাকুক না কেন, নীলার কোট করা গল্প পড়ে আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। গল্পের কিছু বিষয়কে যদিও সে বর্তমান সময়কে পেরিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ দাম্পত্য জীবনের সঙ্গে গেঁথে দিয়েছে, তথাপি তাতে তার যে রসবোধের পরিচয় পেলাম, সেটা তোলে ধরার লোভ সামলানো দায় হলো। তাই নীলার লেখা পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করলাম।

১। গত শীতে ফেবুতে শীত নিয়ে এক স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। তাতে এক বান্ধবী লিখল, ‘শীত নিবারণে পাশে আছি।’ আমিতো পড়লাম মহা বিপদে। ভরকে গেলাম। না জানি, তিনি আবার শীত নিবারণের কোন পদ্ধতি চালাতে চান! তাই কিছু উত্তর করার আগেই তার প্রোফাইলে ঢুকলাম। দেখি তিনি তূলা উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা। যাক বাবা …। 

২। গত দিন ঘুম হতে উঠে ফেসবুক অন করতেই দেখি এক বান্ধবীর ইনবক্স বার্তা, ‘শুভ সকাল।’ এ আমার কেমন বান্ধবী! ওয়ালের ছবি দেখে তো মনে হচ্ছে স্কুল পড়ুয়া। ইদানীং অবশ্য অসম বয়সের প্রেমে হিড়িক পড়েছে। সেটা আমার কথা নয়, গবেষণার। সে হিসাবে আমার বান্ধবী তো কেবল ফেবু বান্ধবী, এ আর এমন কী? তবু প্রশ্ন থেকেই যায়, এই শুভ সকালের মানে কী? অবশ্য কম বুঝাই ভালো।

৩। এ বছরের শুরুর দিকের কথা। একদিন আমার ছোট ভাই একটি চলমান চ্যাটিং গ্রুপে জলদি করে আমাকে যুক্ত হতে বললো। আমিও বিস্তারিত না জেনেই যুক্ত হয়ে গেলাম। ঢুকেই চলমান চ্যাটের ম্যাসেজ পড়ে ভয় পেয়ে গেলাম। ভয় পাওয়ার মতোই কথা, ‘জ্যান্ত বা জবাই যেমনে চান, পেয়ে যাবেন। আপনি বললে কল্লা ফেলে দিয়ে কলিজা বের করে ফেলব।’ আমি ভাবছি, ছোট ভাই আমাকে আবার এ কোন সন্ত্রাসীর জগতে নিয়ে এলো। প্রোফাইল ঘেঁটে দেখি বেটা মুরগি দোকানের মালিক। মানে একটি প্রোগ্রামের জন্য মুরগি কিনা নিয়ে কথা হচ্ছে। আমি যেহেতু প্রোগ্রামের একটি অংশ, তাই আমাকে এ চ্যাটে যুক্ত করা।

৪। মাঝ রাতে ঘুম ভাঙতেই মোবাইল হাতে নিলাম। দেখি খানিক আগে একটি বার্তার প্রবেশ হয়েছে, ‘এতো অপেক্ষা, তবু দিলেন না।’ আমি একটু হতচকিত হলাম। এ আবার কেমন বান্ধবী যার আমার জন্য অপেক্ষায় সময় যায়। আবার কিছু পেতেও চায়। ফেবুতে রি-একশন প্রতীক পাঠানো ছাড়া কী বা আর দেওয়ার আছে! আমিও আগ্রহ নিয়েই জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিসের জন্য অপেক্ষা? কী চাই আপনার?’ বান্ধবী দেখি এতো রাতেও ঘুমায়নি। সঙ্গে সাথেই উত্তর, ‘আপনার লিখা চাই। ভুলে গেছেন বুঝি। সেদিনই তো কথা হলো। আপনাকে যে লক-ডাউন নিয়ে একটি গল্প লিখতে বললাম।’

৫। ক’দিন আগে আর এক বান্ধবীর প্রশ্ন, ‘স্যার, আপনি কী দ্বিতীয় প্রেমে বিশ্বাসী?’ আমি তাড়াতাড়ি ল্যাপটপটা বাঁকা করে আমার স্ত্রীর আড়াল করে উত্তর দিলাম, ‘শর্ত এবং স্বার্থের সাংঘর্ষিক না হলে হতে পারে।’ ফের প্রশ্ন, ‘স্যার স্থির করে বলুন। আপনার কথার উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। আপনি চাইলে আমি আগাব।’ আমি পড়লাম মহা বিপদে, ‘দেখুন, আমি আপনার বাবার বয়সী। এ বয়সে আমাকে জড়াবেন?’ মেয়ে দেরি না করেই টাসটাস উত্তর লিখে যাচ্ছে, ‘সে জন্যই তো আপনার মতামত চাচ্ছি। আপনি সম্মতি দিলে আমি কালই কাজী অফিসে যাব। ও আমাকে বিয়ে করতে চায়।’ বাবারে বাবা, তার অভিজ্ঞতা দেখি কম নয়। আমি আর কী জ্ঞান দিব!

৬। এক রাতে এক বান্ধবীর ছোট বার্তা পেলাম, ‘হাই।’ আমি রিপ্লাই না করাতে বার কয়েক হাই, হ্যালো বার্তা ছুটে এলো। তাতেও কাজ না হওয়ায় তিনি কল করে বসলেন। অনেক ভেবে চিনতে ফোন ধরলাম। তার কণ্ঠে ভেসে এলো, ‘কাটবেন না প্লিজ। আমি কথা বলতে চাই।’ স্ত্রীর ভয়ে কপাল কুঁচকে বললাম, ‘বলুন।’ ওপ্রান্ত থেকে ধ্বনিত এলো, ‘আপনার নাম কী?’ আমার রাগ বেড়ে গেল, ‘নাম না জেনেই ফোন করেছেন।’ আমার কথা শেষ হবার আগেই সে ফ্লোর কেঁড়ে নিলো, ‘তা, জানি। কিন্তু আপনার কণ্ঠে শুনতে চাই। আজ রাত আমি আপনার সঙ্গে কথা বলে কাটাতে চাই। আজ অনেক কিছু নতুন করে জানব।’ কিছু বুঝে ওঠার আগেই, আমার স্ত্রী ফোন কেঁড়ে নিলো, ‘তুমি কে, কী চাও?’ মনে হলো ওপ্রান্ত চমকে গেল, ‘ওমা, আপনি কে?’ শাসানো স্বরে আমার স্ত্রীর উত্তর, ‘তুমি যাকে কল করেছ তার স্ত্রী।’ ওপ্রান্ত যেন হতাশ হলো, ‘কী সব বলেন! আমাদের ইংরেজি স্যার মানে কামাল স্যার তো বিয়ে করেননি। এটা আবার কোন কামাল? স্যরি।’

৭। সেদিন আমার এক স্কুল বান্ধবীর বার্তা পেলাম। তাতে লেখা, ‘রূপ ছিল অঙ্গেতে মোর, যৌবন ছিল মনে। মনের যৌবন জিইয়ে রেখেছি, বন্ধু তোমায় দিব বলে।’ আমি পড়ে অবাক হলাম। এই ছিল বান্ধবীর মনে। বড় উসখুস মনে জানতে চাইলাম, ‘কী বান্ধবী, এই ছিল তোর মনে, বললি কেন অবেলা অখনে!’ বান্ধবীর উত্তর পেয়ে হতাশ হলাম, ‘আরে হারামি, কী সব লিখস। বানান ভুলে ভরা। তোর গানে লিখা ‘রূপ ছিল ওঙ্গেতে মোর, যউবন ছিল মনে। মনের যউবন ঝিইয়ে রেখেছি, বন্ধু তোমায় দিব বলে।’ বাক্যের বানান ঠিক করে দিলাম।’

নীলার সংযুক্তি পড়তে পড়তে মনে হলো ফেবু বন্ধুরা আসলেই বিচিত্র। অচেনা অজানার সুযোগ নিয়ে কতো পাগলামিই না তারা করে। এই যেমন সেদিন একজন প্রশ্ন করল, ‘ভাই আপনি কে?’ আচ্ছা, আমার ইনবক্সে এসে আমার পরিচয় জানতে চাওয়া কেন? ওর মাথায় কী গণ্ডগোল হচ্ছে? করোনাকালে গণ্ডগোল লাগা অস্বাভাবিক না। দীর্ঘদিন বাসায় থেকে অতি চেনা বিষয় যেন ভুলে যাচ্ছি। তাই গণ্ডগোল আমায় মাথাতেও লেগেছে। হঠাত ‘আপনি কে?’ প্রশ্নটা শুনে আমিও মনে করতে পারলাম না যে, আমি কে? আমিও ভাবছি। কিন্তু উত্তর পাচ্ছি না। আচ্ছা, আমি কী যেন করতাম? মনে হয় এককালে মাস্টারি করতাম, না? সেটা মনে হয় করোনা কালের আগের কোন ঘটনা! আচ্ছা, করোনা যেন কবে এসেছিল?

তবে এই ভুলা-ভুলির কালে নীলার সঙ্গে আমার প্রেম ভালোই জমেছে। তার জন্যই আজ আমার মান রক্ষা হলো। তাই তাকে জানিয়ে দিলাম,
‘আজ নিশিতে জাগবো দু’জন
কইবো কথা সাধ যতো।
মন সিকেতে ঝুলবো তখন
টানবো ধরে প্রেমের সুতো।
বাও-বাতাসে উড়ে উড়ে
ছুটবো যখন তোমার পানে।
যদি আঁচল নাগাল পরে
বাঁধবো প্রেমের বাঁধনে।
তুমি রেখা না, রেখা না
আমায় দূরে সরাইয়া।
লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদ
সব যাব ছাড়িয়া।’

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর