Alexa আমাকে আকুল করেছিল আজানের সুর : নার্গিস ফাতেমা

নওমুসলিম নারীর সাক্ষাৎকার

আমাকে আকুল করেছিল আজানের সুর : নার্গিস ফাতেমা

পর্ব-২

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:২৮ ১১ নভেম্বর ২০১৯  

আল্লাহু আকবার- ফাইল ফটো

আল্লাহু আকবার- ফাইল ফটো

সানা হুজাইফা : আচ্ছা, আপনি যখন ইসলাম কবুল করলেন তখন আপনার পরিবারে কী প্রতিক্রিয়া হলো? তাছাড়া আপনি কী তাদেরকেও ইসলামের পথে আনবার চেষ্টা করেছেন?

আরো পড়ুন>>> নওমুসলিম নারীর সাক্ষাৎকার আমাকে আকুল করেছিল আজানের সুর : নার্গিস ফাতেমা পর্ব-১

নার্গিস ফাতেমা : আমার মা বাবার ইন্তিকালের পরে আমার ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করেছি। তিনি আমার প্রতি চরম অসন্তুষ্ট ছিলেন। বলতেন তোমার কারণেই আম্মু আব্বু মারা গেছেন। এর পুরো দায় দায়িত্ব তোমার। তারপর আমি নিয়মিত তার সঙ্গে দেখা করতে থাকি। আমি আমার ঘরেও তাকে বরাবর দাওয়াত দিতে থাকি। ফোনে নিয়মিত কথা বলবার চেষ্টা করি। শুরুর দিকে আমার সঙ্গে কথাই বলতে চাইতেন না। একেবারে ঠেকায় পড়ে দু’চার কথা বলতেন। আলহামদুলিল্লাহ! পরে সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে থাকে। আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহে একসময় তিনিও কালেমা পড়েন। তারপর বিয়ে করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ! ভাবিও ইসলাম কবুল করেছেন। 

সানা হুজাইফা : আচ্ছা, ইসলাম কবুল করার আগে আর ইসলাম কবুল করার পর আপনার জীবনে কী কোনো ব্যবধান তৈরি হয়েছে? এই ধরুন দৈনন্দিন জীবন যাপন, আচার আচরণ, ব্যক্তি জীবন এইসব ক্ষেত্রে মুসলমান হওয়ার পর কোনো ধরণের পরিবর্তন এসেছে কী?

নার্গিস ফাতেমা : কথা কী, ইসলাম কবুল করার আগে আমার ভেতরে বরাবর একটা অস্থিরতা কাজ করতো। বলেছি শৈশব থেকেই ইসলামের প্রতি আমার একটা আকর্ষণ ছিল। আমার মনের ভেতর এক ধরণের অস্থিরতা ছিল। নীড়হারা পাখি নীড়ের খুঁজে যেমন অস্থির থাকে ঠিক তেমন। আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ তায়ালা আমাকে অনুগ্রহ করে ইসলামের ধণে ধন্য করেছেন। অসামান্য সম্মান দান করেছেন। আমার কাছে মনে হয়েছে যেন আমি ঘরহারা ছিলাম। ঘরে ফিরে এসেছি। আমার জীবন স্বস্তি ও তৃপ্তিতে ভরে উঠেছে। ইসলামের প্রতিটি বিষয় আমার কাছে খুব ভালো লাগে। বলেছি ইসলামের পর্দা প্রথা স্বভাবগত ভাবেই আমার প্রিয়। এখন আমার একটাই প্রেরণা আমারণ যেন আমি আমার প্রভুর সন্তুষ্টির ছায়ায় থাকতে পারি। শয়তানের প্ররোচনা আমাকে যেন কখনো পদচ্যুত না করে। আমিন।  

সানা হুজাইফা : আচ্ছা, তারপর কী হলো?

নার্গিস ফাতেমা : বলেছি ইসলাম কবুল করার পর আমাকে বেশ কিছু প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমি নিজে নিজেই ইসলাম কবুল করে নিয়েছিলাম। ঘরের মধ্যে একাই নামাজ পড়তাম। আমাদের পরিবার একটি শান্ত-শিষ্ট হিন্দু পরিবার। ওই হিন্দু পরিবারের ভেতরে থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে নামাজ রোজা করতাম। বলার অপেক্ষা রাখে না এটা কোনো সহজ কথা না। আজ হোক কাল হোক, পরিবার সেটা টের পাবেই। এভাবে ধীরে ধীরে তিন বছর কেটে যায়। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে নামাজ পড়ি। আর ভাবি কখন ধরা পড়ে যাই। ততদিনে আমার বিয়েরও বয়স হয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মেই আমাকে একজন হিন্দু ছেলের সঙ্গে বিয়ে বসতে হবে। এসব বিষয়ে আমাকে মানসিকভাবে বরারব অস্থির করে রাখতো। আমি ঘরে যখন লুকিয়ে লুকিয়ে নামাজ পড়ি তখনও এমনটা কল্পনা করতাম না একজন হিন্দু ছেলের সঙ্গে বিয়ে হলে আমার পক্ষে নামাজ পড়া সম্ভব হবে না। তাছাড়া এটাও জানা ছিল না, একজন মুসলমান মেয়ে কোনো হিন্দুকে বিয়ে করতে পারে না। আমি বরং মনে মনে আনন্দিত ও আপ্লুত ছিলাম এই ভেবে হে আল্লাহ! আমি যখন তোমাকে পেয়েছি তখন বেহেশতও পাবো। আর বেহেশতে থাকবো আমি মহা সুখে। আর এখানে যদি কোনো হিন্দুর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে যায় হোক। তাতে কী। অর্থাৎ আমার জানা ছিল না, এই দু’টোর মিলন কখনো হতে পারে না। হয় আমি মুসলমান থাকবো না হয় কোনো হিন্দুকে বিয়ে করবো। মাওলানা ইসলাম উদ্দীন সাহেবের সঙ্গে আমার কথা হলো। তিনিও তখনো আমাকে এসব কথা বলেননি। মূলত তিনি আমাকে ধাপে ধাপে ইসলাম সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছিলেন। আর এটা স্বাভাবিক কথা, যদি একসঙ্গে সবকথা বলে দেয়া হয় তাহলে তো ভয়ে পালিয়ে যাওয়ার দশা হবে। মাওলানা সাহেবের সঙ্গে আমার কথা হয়। পুরো বিষয়টি তাকে আমি খুলে বলি। তিনি তখন বলেন তোমাকে প্রথমেই ঘর ছাড়তে হবে। যদি তোমার মা বাবা তোমাকে কোনো হিন্দু ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেয় তাহলে সীমাহীন পাপের মধ্যে পড়ে যাবে। তিনি আমাকে এমন অনেক বিষয় সবিস্তারে বলেন। যা আমার পূর্বে জানা ছিল না। তারপর ভেতরে ভেতরে আমি চরম অস্থিরতায় পড়ে যাই। ভাবতে থাকি হায় আল্লাহ! এখন আমি কী করবো? এখন আমার পক্ষে ঘরে থাকা সম্ভব নয়। এদিকে আমার মন কোনোভাবেই মা বাবাকে ছেড়ে যেতে প্রস্তুত নয়। মা বাবাও এমন অসাধারণ মা বাবা সারা জীবন যারা আমাকে একমাত্র কন্যা হিসেবে লালন পালন করেছেন আমি কী করে তাদেরকে ছেড়ে যাবো। তাদের ভালোবাসার ছায়া থেকে সরে গিয়ে বেঁচে থাকবো এটা ছিল আমার কল্পনাতীত। আমি সীমাহীন দূর ভাবনার চক্রে পড়ে যাই। আমার বাবা সৌদি আরব থাকতেন। তিনি দেশে চলে এসেছেন। সর্বক্ষণ আমার বিয়ে কথা ভাবছেন। আমার ভেতরে এতোটা সাহস ছিলো না মা বাবা ছেড়ে কোথাও চলে যাবো। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলবো আমি কোনো হিন্দু ছেলেকে বিয়ে করবো না একথা বলবার সাহসও আমার ছিল না। এমনকী বাবার মুখোমুখী দাঁড়িয়ে কথা বলার চরিত্রও আমার ছিল না। 

একদিন আমি কোনোরকম সাহস করে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি। ঠিক ঘর থেকে বেরিয়ে পড়াও নয়। আমার পরীক্ষা ছিল। সেদিন ছিল শেষ দিন। পরীক্ষা শেষ করে আমি সোজা দিল্লি চলে আসি। আসার আগে মাওলানা সাহেবকেও ফোন দিইনি। দিল্লির কাছাকাছি এসে তাকে ফোন দিই। বলি আমি চলে এসেছি। আপনি আমাকে বলেছিলেন এখানে মাদরাসার মতো একটি প্রতিষ্ঠান আছে সেখানে মেয়েরা থাকে। ইসলাম কবুল করারও ব্যবস্তা আছে। ওখানে তাদের পড়াশোনারও ব্যবস্থা আছে। আমি সেখানে উঠতে চাই। কথা কী, এই ধরণের কিছু আলোচনা মাওলানা সাহেব করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যাদের কোনো আশ্রয় নেই এবং যারা ইসলাম কবুল করে ছায়াহারা হয়ে পড়েছেন তাদের জন্যে এমন একটি ব্যবস্থা আছে। ওখানে তাদের শিক্ষা দীক্ষারও ব্যবস্থা আছে। নামাজ রোজা ইত্যাদি শেখানো হয়। আমি চাইলে সেখানে এসেও থাকতে পারি। আমি ভেবেছি বাড়ি থেকে চলে গেলে সেখানে গিয়ে উঠতে পারবো। চিন্তা করেছি আগে ওখানে গিয়ে উঠি। তারপর মা বাবাকে ফোন করবো। কিন্তু তখন ছিল ঈদের ছুটি। রোজার ঈদ কিংবা কোরবানির ঈদ। আমি ঠিক বলতে পারবো না। যখন ফোন করলাম তখন মাওলানা সাহেব আমাকে বললেন, এখন তো এখানে কেউ নেই। আর আমরা অচেনা একজন মেয়েকে আশ্রয় দিতে পারি না। যদি ভাই কিংবা বাবা সঙ্গে থাকে তাহলে ভিন্ন কথা। একা একজন মেয়েকে আমরা থাকতে দেবো কী করে! 

একথা শুনে আমি অস্থির হয়ে পড়ি। হায় আল্লাহ! আমি এখন কী করবো? আমি তো বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছি। এখন যদি ফিরে যাই তাহলে তাদেরকে কী বলবো? একবার ভেবে দেখুন! এরই মধ্যে দিল্লি পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় সাত ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। বাসা থেকে বেরিয়েছি প্রায় আট নয় ঘণ্টা হলো। এতোক্ষণে বাড়িতে নিশ্চয় হইচই পড়ে গেছে। পাড়ার সকল মেয়ে পরীক্ষা দিয়ে ঘরে ফিরেছে। ফিরিনি কেবল আমি। ইমাম সাহেবের সঙ্গে কথা বললাম। আমার অস্থিরতার কথাও বললাম। বললেন, তুমি নিশ্চিন্তে ঘরে ফিরে যাও। একেবারে দুশ্চিন্তা করো না। পরে আমি নিজে গাড়ি নিয়ে আসবো। নিজ দায়িত্বে তোমাকে সেন্টারে পৌঁছে দেবো। এখন সেখানে কেউ নেই। এই অবস্থায় তোমাকে সেখানে কোনোভাবেই রাখতে পারি না। তিনি আমাকে অভয় দিয়ে বললেন, আল্লাহ তায়ালা সবকিছু ঠিক করে দেবেন। আমি বললাম আমি কোনো ভাবেই ঘরে ফিরে যেতে পারবো না। আমি আমার মা বাবা এবং ভাইকে কী বলবো? তারা আমার সম্পর্কে এতোক্ষণ কী ভেবেছেন? জানতে চাইবেন তুমি কোথায় গিয়েছিলে? তাছাড়া প্রতিবেশীরা তাদেরকে খোটা দেবে। 

অবশেষ মাওলানা সাহেব আমাকে ঘরে পাঠিয়ে দিলেন। বাধ্য হয়ে আমিও ঘরে ফিরে এলাম। ঘরে ফিরে আসছিলাম আর বারবার ভাবছিলাম তারা আমাকে নানা প্রশ্নবানে জর্জরিত করবেন। আমি তাদের কী জবাব দেবো? জানতে চাইবেন, এতোক্ষণ কোথায় ছিলে? কোথায় গিয়েছিলে? আমি ভেতরে ভেতরে ভয়ে মরে যাচ্ছিলাম। এর আগে কখনো আমি আমার জেলার বাইরে একা কোথাও যাইনি। আর শহরেও যে যেতাম সেটাও এলাকার সহপাঠীনীদের সঙ্গে। আমি বলতে পারবো না আল্লাহ তায়ালা হঠাৎ করে আমার মধ্যে কীভাবে এতো সাহস দিলেন আমার মতো একজন ভীতুপোঁকা একা দিল্লি চলে গেলাম। আল্লাহ তায়ালাই আমাকে সাহস দিয়েছিলেন। ওই সাহসের ওপর ভর করেই আমি একা বেরিয়ে পড়েছিলাম। আবার একাই এখন ফিরে যাচ্ছি। মাওলানা সাহেব আগেই আমাদের ঘরে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিলেন আপনাদের মেয়ে ভুল বাসে চড়ে অনেক দূর চলে এসেছিলো। আমরা তাকে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছি। অবশ্য মাওলানা সাহেব আমার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে কিছুই বলেননি।

আমি কোনো ক্রমে বাড়ি ফিরে আসি। যখন ঘরে ফিরি তখন যে কী অবস্থা হয়েছিলো বলতে পারবো না। মা একাধারে কাঁদছেন। কাঁদছেন আর বলছেন তুমি কোথায় গিয়েছিলে? আমি মরে যাবো। আমার কাছে কোনো উত্তর নেই। আমি মুসলমান হয়েছি। সেকথাও বলতে পারছি না। ব্যাস। মায়ের সঙ্গে আমিও কাঁদছি। তিনি যা বলছেন আমি শুনে যাচ্ছি। তারপর তিনি আমাকে সোহাগ করে বললেন, ভবিষ্যতে আর কখনো এভাবে না বলে কোথাও যাবে না। আমাকে দীর্ঘক্ষণ বুঝালেন। আমিও বললাম, আর কখনো আমি এভাবে যাবো না। এভাবে এক দুই দিন কেটে যায়। তারপর আমার ভেতরে শুরু হয় এক মহা আলোড়ন। আমি ভাবতে থাকি এভাবে আর কতোদিন লুকোচুরি করবো। আল্লাহ তায়ালা আমাকে শক্তি দান করলেন। তখন জোহর নামাজের সময় হয়ে গিয়েছিলো। আমি ওজু করলাম। আর লুকিয়ে লুকিয়ে নয়। সোজা বারান্দায় গিয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলাম।

বাইরে থেকেওে বারান্দায় দাঁড়ানো যে কাউকে দেখা যায়। মুসল্লা তো ছিলো না। মেঝেতেই নামাজে দাঁড়িয়েছি। আমাকে নামাজ পড়তে দেখে মা ছুটে আসেন। হইচই শুরু করে দেন। কী করছো? কী করছো? তারপর সজোরে আমার গালে চড় বসিয়ে দেন। ধমক দিয়ে বলেন, কী হয়েছে তোমার? কে তোমাকে কী খাইয়েছে বলো। নিশ্চয় কেউ তোমাকে যাদু করেছে। মা এসব কথা বলতে থাকেন, কাঁদতে থাকেন। তারপর আমাকে ধরে বাইরে নিয়ে আসেন। ভাইয়াকে ডাকেন অনুক্ত জলদি আসো। একে কেউ যাদু করেছে। দেখো এ কী করছে এসব। চলবে...

সূত্র: মাসিক আরমোগান উর্দু, সেপ্টেম্বর ২০১৯
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: সানা হুজাইফা
ভাষান্তর: মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন
সংগ্রহ : নুসরাত জাহান

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে