আজ হজ: আরাফার ময়দানে অবস্থানের গুরুত্ব ও ফজিলত

আজ হজ: আরাফার ময়দানে অবস্থানের গুরুত্ব ও ফজিলত

ওমর শাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১২:১৯ ৩০ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১৪:২৯ ৩০ জুলাই ২০২০

হজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান হচ্ছে জিলহজের ৯ তারিখে আরাফার ময়দানে অবস্থান। সামান্য মুহূর্তের জন্যও যদি কোনো হাজি আরাফার ময়দানে নির্দিষ্ট সময়ে অবস্থান করতে না পারে তাহলে তার হজই কবুল হবে না।

হজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান হচ্ছে জিলহজের ৯ তারিখে আরাফার ময়দানে অবস্থান। সামান্য মুহূর্তের জন্যও যদি কোনো হাজি আরাফার ময়দানে নির্দিষ্ট সময়ে অবস্থান করতে না পারে তাহলে তার হজই কবুল হবে না।

আজ পবিত্র হজ। জিলহজ মাসের ৯ তারিখ আরাফার ময়দানে উপস্থিত হওয়ার নামই হজ। পবিত্র নগরী মক্কা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ স্থানে একত্রিত হওয়া হজের অন্যতম রোকন। ৯ জিলহজ সূর্যাস্তের আগে আরাফার ময়দানে উপস্থিত না হলে হজই হবে না। 

আজ ৯ জিলহজ জাবালে রহমত থেকে শুরু করে মসজিদে নামিরাসহ আরাফার ময়দানের চিহ্নিত সীমানার মধ্যে যেকোনো সুবিধাজনক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে হজ সম্পন্ন করবে মুমিন মুসলমান।

আরাফা শব্দটি আরবি। যার অর্থ হচ্ছে পরিচয় লাভ করা। কথিত আছে যে, আদম ও হাওয়া (আ.)-কে দুনিয়াতে প্রেরণ করা হয় বিচ্ছিন্ন অবস্থায়। কারো সঙ্গে কারো কোনো যোগাযোগ ছিলো না। দুনিয়াতে আসার পর সর্বপ্রথম পরিচয় হয় আরাফার ময়দানে। তাই উক্ত স্থানকে আরাফা হিসেবে নাম করণ করা হয়।

বর্তমানে আরাফার ময়দানের অবস্থান হচ্ছে, এটি মক্কা মুকাররমা থেকে পূর্বদিকে আনুমানিক ৯ মাইল আর মিনা থেকে ছয় মাইল দূরে অবস্থিত। আরাফার ময়দানে অবস্থান করাই হজের মূল কাজ। এ মূল কাজটি আজ আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন করবে হজ যাত্রীরা।

ইসলামের পূর্ণতা ঘোষণা হয় এই ময়দানে:

আরাফার ময়দান ঐতিহাসিকভাবে অনেক গুরুত্ব বহন করে। প্রিয় নবী (সা.) এর ওপর আল কোরআনের সর্বশেষ আয়াত, যাতে দ্বীন ইসলামকে কেয়ামত পর্যন্ত পরিপূর্ণ দ্বীন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে উক্ত আরাফার ময়দানেই নাজিল হয়েছিলো। আল কোরআনের সেই আয়াতটি হচ্ছে অর্থাৎ ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম। এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীনরূপে মনোনীত করলাম।’ (সূরা: মায়েদা, আয়াত: ৩)।

আয়াতের মর্মের গুরুত্ব উপলব্ধির জন্য এই ঘটনাই যথেষ্ঠ যে, একবার এক ইহুদী এসে হজরত ওমর (রা.)-কে বলেছিল, তোমাদের ওপর এমন একটি আয়াত নাজিল হয়েছে, তা যদি আমাদের ওপর নাজিল হতো তাহলে সেই নাজিল হওয়ার দিনটিকে আমরা আমোদ-ফূর্তিতে কাটানোর জন্য ঈদ বানিয়ে নিতাম। মূলত ইসলাম তখন সব দিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিলো। মক্কায় কোন মুশরিকের আস্ফালন ছিলো না তখন। মক্কা মুসলমানদের বিজিত এলাকা। শয়তানকে নিরাশ করা হয়েছিলো যে, আরব দ্বীপে আর কখনো মূর্তিপূজার সুযোগ হবে না। শয়তানের জন্য এই দুঃসংবাদ কোরআন নাজিলের মাধ্যমে দেয়া হয়েছিলো। ইরশাদ হয়েছে ‘আজ কাফেররা তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে (অর্থাৎ দ্বীন ইসলামকে মিটিয়ে দেয়ার মিশনের ব্যাপারে) নিরাশ হয়ে গেছে। অতএব, তোমরা ওদেরকে ভয় করো না বরং আমাকেই ভয় করো।’ (সূরা: মায়েদা, আয়াত: ৩)।

তবে নবী করিম (সা.) উম্মাহকে শয়তানের নিরাশার সুসংবাদ দানের সঙ্গে সঙ্গে একটা আশংকার ব্যাপারেও সতর্ক করেছিলেন যে, মূর্তিপূজার ব্যাপারে সে নিরাশ হলেও তোমাদের পরস্পর উসকিয়ে দেয়ার কাজে সে সর্বদা লেগে থাকবে। সেই বাস্তবতা আজ আমাদের সামনে। আরবের আমীর সম্প্রদায় নিজেরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন। কেউ কারো সহযোগিতায় এগিয়ে আসছে না। বরং শয়তান এবং তার দোসরদের উস্কানিতে একে অপরের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে মত্ত।

বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণ দেয়া হয়েছিলো আরাফার ময়দানে:

আরাফার দিনের গুরুত্বের আরেকটি কারণ হচ্ছে, বিদায় হজের ভাষণ। নবী করিম (সা.) দশম হিজরিতে হজে এসে এখানেই ভাষণ দিয়েছিলেন। এটাই ছিলো তাঁর জীবনের শেষ হজ, যা বিদায় হজ নামে পরিচিত। তাঁর ভাষণে এমন কিছু বিষয়বস্তু ছিলো, যা শুধু ধর্মের ইতিহাসেই নয় বরং বিশ্ব মানবতা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসেও বিরল। তাঁর ভাষণে নারী অধিকারের বিষয়ে কথা ছিলো। নারীদের নিয়ে তার ভাষণ ছিলো ওই সময় যখন নারীদেরকে অন্যান্য সমাজে মনে করা হতো পশুর মতো ভোগের বস্তু। দাস প্রথা ছিলো তখনকার সময়ের অন্যতম বিষয় এবং তৎকালীন সমাজ ব্যব¯হার অপরিহর্য অনুসঙ্গ। তিনি তাদের ব্যাপারেও বিদায় হজের ভাষণে কথা বলেছেন।

তাঁর আহ্বান ছিলো ‘তারা তোমাদেরই ভাই। তাদেরকে তাই খেতে দেবে, যা তোমরা নিজেরা খাও। পরতে দেবে তাই, যা তোমরা নিজেরা পর। অনেকে বলে ইসলাম নাকি একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন সামাজ ব্যবস্থা। আর তারা নিজেরা নাকি আলোর যুগের। তারা একটু ভেবে দেখুক! এ আহ্বান কোন জামানার ছিল? বস্তুত এটা ছিল একজন উম্মি ব্যক্তির ঠিক ওই সময়ের আহবান যখন এ বিষয়ে কারো না ছিল কোনো ভ্রুক্ষেপ, আর না ছিলো চেতন। প্রকৃত কথা হলো ইসলাম মানবাধিকার ও মনুষ্যত্ব বিকাশে যে অবদান রেখেছে আজকের বস্তুবাদি কোনো মতবাদই তাঁর সমকক্ষতার দাবি করতে পারবে না। রাসুল (সা.) এর একটি আহ্বান ছিলো মানুষের জান-মাল ও ইজ্জত আব্রুর নিরাপত্তা নিয়ে। তিনি বলেছিলেন, তোমাদের একজনের ওপর অন্যজনের জান, মাল, ইজ্জত আব্রু তেমনি সম্মানিত, যেমন সম্মানিত এই মাস, আজকের এই দিন...।

এভাবে মানবাধিকার ও মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের ঘোষণা এসেছিলো এমন এক ব্যক্তির মুখ থেকে যিনি মানবাধিকার বা মৌলিক অধিকার নিয়ে কোনো পড়াশুনা করেছেন, আর না কোনো ভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রিও লাভ করেছেন। নিসন্দেহে তা ছিলো আল্লাহর বাণী, যা তার মাধ্যমে প্রচার হয়েছিলো।

আরাফার ময়দানে অবস্থানের ফজিলত:

জিলহজের নয় তারিখে হাজি সাহেবরা যখন আরাফার ময়দানে অবস্থান করেন তখন তাদের ওপর আল্লাহ তায়ালার তরফ থেকে অগণিত রহমত নাজিল হতে থাকে। অসংখ্য আদম সন্তানকে মাফ করে দেয়া হয়। এই অবস্থা দেখে শয়তানের গায়ে জ্বালা শুরু হয়। এবং আরাফার দিন শয়তান যতটুকু রাগান্বিত হয় অন্য কোনো সময় এত রাগান্বিত  হয় না। হাদিসে এসেছে  ‘শয়তান অন্যকোনো দিনে নিজেকে এত ছোট, অপদস্ত মনে করে না যতটুকু আরাফার দিনে মনে করে। ওকে এতবেশি রাগান্বিত কখনো দেখা যায় না যতটুক আরাফার দিনে দেখা যায়। তার এই অবস্থার কারণ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে রহমত নাজিল হওয়া এবং অগণিত গোনাহগার বান্দাকে ক্ষমা করে দেয়া। (মুয়াত্তা ইমাম মালেক)।

হজরত আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত অন্য এক হাদিসে এসেছে, নবী করিম (সা.) বলেন, আরাফার দিনে যে পরিমান বান্দাকে আল্লাহ তায়ালা মুক্ত করেন, অন্যকোনো সময়ে তা হয় না। আল্লাহ তায়ালা তখন আপন রহম ও দয়ার গুণের সঙ্গে আরাফায় অবস্থানকারী বান্দাদের কাছাকাছি চলে আসেন। তারপর ফেরেস্তাদের সঙ্গে ফখর করে বলেন, তারা (আরাফায় অবস্থানকারী বান্দারা) কী চায়? (সহিহ মুসলিম)। রহমত ও দয়ার গুণের সঙ্গে আরাফায় অবস্থানকারীদের নিকটে এসে যাওয়ার দ্বারা ইঙ্গিত হচ্ছে বান্দাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া।

হজে আরাফায় অবস্থানের গুরুত্ব:

হজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান হচ্ছে জিলহজের ৯ তারিখে আরাফার ময়দানে অবস্থান। সামান্য মুহূর্তের জন্যও যদি কোনো হাজি আরাফার ময়দানে নির্দিষ্ট সময়ে অবস্থান করতে না পারে তাহলে তার হজই কবুল হবে না। হজের অন্যান্য বিধান যেমন তওয়াফ, সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সায়ী করা, মুজদালিফায় অবস্থান ইত্যাদি কোনো কারণে ছুটে গেলে তা পূরণ করার ব্যবস্থা আছে কিন্তু আরাফার ময়দানে অবস্থান কোনো কারণে ছুটে গেলে তা পূরণ করার কোনোই ব্যবস্থা নেই। এ ব্যাপারে ইমাম তিরমিজী ও নাসায়ী সহ আরো অনেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন যে, হজ হচ্ছে আরাফার ময়দানে অবস্থানের নাম। তাই হজের বিধান হিসেবে আরাফার ময়দানে অবস্থান করার গুরুত্ব অপরসীম। 

আরাফার ময়দানে অবস্থান সংক্রান্ত বিভিন্ন বিধিবিধান:

এক. আরাফার ময়দানে অবস্থান করার জন্য গোসল করে নেয়া মুস্তাহাব।

দুই. আরাফার ময়দানে সবজায়গায় অবস্থান করা বৈধ। তবে রাস্তা এবং জনবিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করাকে উলামায়ে কেরাম মাকরূহ বলেছেন।

তিন. আরাফায় অবস্থানের জন্য বতনে আরনা নামক স্থানকে নির্বাচন করা নাজায়েজ। বতনে আরনা হচ্ছে একটি পাহাড়ি উপত্যকা, যা আরাফার মসজিদের পশ্চিম পার্শ্বে একেবারে লাগুয়া। উলামায়ে কেরামের মতে উক্ত স্থানটি আরাফার ময়দানের বাহিরে অবস্থিত। 

চার. অবস্থানের জন্য উত্তম পদ্ধতি হচ্ছে সূর্য হেলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত মসজিদে নামিরার নিকটে অবস্থান করা। তারপর সুযোগ হলে জোহরের নামাজের পরেই বা আসরের নামাজের পর জাবালে রহমতে গিয়ে অবস্থান করা।

পাঁচ. আরাফায় অবস্থানের সময় খুব বেশি দোয়া, ইস্তেগফার ও জিকির-আজকার করা। উলামায়ে কেরাম বলেন, আরাফায় অবস্থানের সময় হাত ওঠিয়ে দোয়া করা মুস্তাহাব। নিজের জন্য, পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন ও বন্দু-বান্ধবের জন্য দোয়া করা। দোয়ার মাঝে মাঝে তালবিয়া তথা ‘লাব্বায়িক আল্লাহুমমা লাব্বায়িক.... পাঠ করা। দোয়া কবুল হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা। একাগ্রতার সঙ্গে দোয়ায় মগ্ন হওয়া। মনে রাখতে হবে, সব জায়গায় সমানভাবে দোয়া কবুল হয় না। বরং তার নির্দিষ্ট কিছু জায়গা আছে যেখানে দোয়া কবুল হওয়ার আশা বেশি। এমন একটি স্থান হচ্ছে আরাফার ময়দান। তাই দোয়ার ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়া।

ছয়. গাফলতির সঙ্গে বা শুয়ে শুয়ে আরাফায় অবস্থানের সময় পার করাকে উলামায়ে কেরাম মাকরূহ বলেছেন। তাই হাজিদের কর্তব্য হচ্ছে উক্ত সময়টাকে গণিমত মনে করা। প্রসিদ্ধ ঘটনা আছে- এক গরিবকে আল্লাহ তায়ালা ধনী বানানোর সিদ্ধন্তা নিলেন। তাই কারো ওসিলায় তার সামনে এনে একটা স্বর্ণের টুকরা রেখে দিলেন। কিন্তু ওই লোকের বদআমলের কারণে সে ওই সম্পদ থেকে বিরত হলো। কারণ, যখন সে স্বর্ণের টুকরার সামনে এলো তখন সে অন্ধলোক কীভাবে হাটে তা দেখানোর জন্য চোখ বন্ধ করলো। আর এই ফাঁকে সে স্বর্ণের টুকরাটাকে পেছনে রেখে চলে এলো। তাই আরাফার ময়দানেও আমাদের গাফলতির কারণে আখেরাতে মুক্তির পরোয়ানা হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। তাই ওখানে আমাদের অবস্থা যেন ওই গরিবের মতো না হয়।

সর্বশেষ কথা হচ্ছে, হজের অংশ হওয়ার কারণে যেমন ইবাদতের দিক থেকে আরাফার ময়দান গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বমুসলিমের আন্তর্জাতিক সম্মেলনস্থল হওয়ার কারণেও আরাফার ময়দান গুরুত্বপূর্ণ। লাখ লাখ হাজি, যাদের কারো গায়ের রং কালো, কারো সাদা, তাদের মাঝে আছে আরবি, ইংরেজি, উর্দু ও ফার্সীসহ বহু ভাষাভাষী লোক। সম্পদের দিক থেকে কেউ কোটিপতি আবার কেউ নিজের জীবনের সঞ্চিত অর্থ পুরোটা ব্যয় করেই এখানে জমায়েত হয়েছে, কিন্তু কারো মাঝে বংশ, ভাষা বা অঞ্চল নিয়ে কোনো গর্ব-অহংকার নেই। সবাই এক ময়দানে, এক কাতারে দাঁড়িয়েছে। এর দ্বারা বিশ্বদরবারে ইসলামের সৌন্দর্য ও সাম্যনীতি আরো ভালোভাবে ফুটে ওঠে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে