আকাশ-মিতু ঘটনাবলী: মানসিক অসুস্থতার প্রকাশ

প্রকাশিত: ১২:৪৮ ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯  

অাফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফোব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিতে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

একজন ডাক্তারের আত্মহত্যা নিয়ে  অনেক আলোচনা, সমালোচনা হচ্ছে। সোস্যাল মিডিয়ায় ঝড় উঠছে। মানববন্ধনও হয়ে গেছে।  আত্মহত্যার কারণ  পরকীয়া। 

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ডাক্তার আকাশ ফেসবুকে স্ত্রী মিতুর সাথে বিভিন্ন ব্যক্তির আপত্তিকর ছবি, মেসেজ ও চ্যাটের স্ত্রিনশটসহ আত্মহত্যার কারণ উল্লেখ করে পর পর দুটো পোস্ট দিয়ে শরীরে ইনজেকশন পুশ করে আত্মহত্যা করেন।  আত্মহত্যার জন্য স্ত্রী তানজিলা হক চৌধুরী মিতুকে সরাসরি দায়ি করে  স্টাটাসে লিখেছেন, ‘ভালো থেকো আমার ভালবাসা, তোমার প্রেমিকদের নিয়ে’।

তার এই আত্মহত্যা পরিকল্পিত। ভেবে চিন্তে  ঠান্ডা মাথায়। স্ত্রী মিতুকে একহাত দেখিয়ে দেবার জন্য, তার ওপর প্রতিশোধ নেবার জন্য। 
আত্মহত্যার ঘটনা প্রকাশ পাবার পর থেকেই  তোলপাড় চলছে সোস্যাল মিডিয়ায়। মিতুকে সবাই যা নয় তাই বলছে। এদেশে ডজন ডজন ধর্ষক ধর্ষণ করে মাথা উঁচিয়ে  ঘুরে বেড়ায়। তাদের নিয়ে কখনও এমন প্রতিক্রিয়া দেখিনা। বাচ্চা বাচ্চা মেয়েগুলো ধর্ষিত হয় তখনও সমাজবাদীরা এতটা সোচ্চার হন না মিতুর পরকীয়ার ঘটনায় যতটা হয়েছেন। এদেশে অসংখ্য পুরুষ দিনে রাতে পরকীয়া করে বেড়াচ্ছেন তা নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। যত মাথাব্যথা মিতুকে নিয়ে!

ডাক্তার আকাশের জন্য সত্যিই আমার কোনো সমবেদনা জন্মাচ্ছে না। আমার কষ্ট  হচ্ছে তার বাবা মা আর পরিবারের কথা ভেবে। রাষ্ট্র একজন ডাক্তারের কাছ থেকে অনেক কিছু আশা করে।   জনগণ চায় একজন মেধাবী ছেলে ডাক্তার হয়ে দেশের সেবা করবে, মানুষের সেবা করবে। জনগণ কখনই চায় না পাশ করার পর একজন ডাক্তারের চিন্তা-ভাবনা শুধুমাত্র নিজেকে নিয়ে বা নিজের স্ত্রীর মাঝে ঘুরপাক খাবে । মানুষ আজও বিশ্বাস করে, উপরে সৃষ্টিকর্তা আর নিচে  ডাক্তারদের উপরই নির্ভর করে মানুষের জীবন মরণ!  আর একজন ডাক্তার শুধুমাত্র পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধ নন, তিনি দায়বদ্ধ দেশের প্রতি, সমাজের প্রতি।  পরিবারেরও অনেক আশা থাকে  ডাক্তার ছেলে বা মেয়ের ওপর। ওরা বড় হবে, ভাল মানুষ হবে, বৃদ্ধ বয়সে বাবা -মায়ের পাশে থাকবে । ভাল চিকিৎসা দিয়ে মানুষের কাজে লাগবে।

অথচ  একজন ডাক্তার  আত্মহত্যা করলেন স্ত্রীর পরকীয়ার কারণে । স্ত্রী  পরকীয়া করছেন ডাক্তার সাহেব তাকে থামাতে পারছেন না,  তিনি তাকে তালাক দেননি কেন? যদি স্ত্রীকে খুব  বেশি ভালবেসে থাকেন, স্ত্রীকে ডিভোর্স দেবার পর সারাজীবন আর বিয়ে না করলেই পারতেন।  কিন্তু এটা কী  রকম ভালবাসা!  তিনি অত্মহত্যার মাধ্যমে স্ত্রীকে জব্দ করতে চেয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। যে পুরুষ স্ত্রীকে সত্যিই ভালবাসে সেকী অন্য পুরুষের সাথে স্ত্রীর আপত্তিকর ছবি পোস্ট দেয়।  এটা এক ধরণের অসুস্থ  মানসিকতা!

তিনি ফেসবুক স্টাটাসে লিখেছেন, বার বার তার স্ত্রীকে বলেছেন, আমাকে ভাল না লাগলে ছেড়ে চলে যাও, চিট করো না। স্ত্রী তাকে ছাড়েননি।  বেশ,  ডাক্তার সাহেব তাকে ছাড়েননি কেন? আমাদের ধর্মে স্বামী স্ত্রী দুজনেরই ডিভোর্স দেবার অধিকার আছে । পরপুরুষ আসক্ত স্ত্রীর  সাথে সংসার করেছেন কেন, কীভাবে? স্টাটাসে তিনি লিখেছেন, বিবাহের আগেই তিনি জানতে পেরেছিলেন, মাহবুব নামের একজন পুরুষের সাথে তার স্ত্রী রাত কাটিয়েছে ।  কিন্তু লোকজনকে দাওয়াত দেয়া হয়ে গেছে বলে তিনি বিয়ে করেছিলেন। ব্যাপারটা অদ্ভুত!  পরকীয়া আসক্ত জেনেও তিনি মিতুকে বিয়ে করলেন ভবিষ্যতের কথা না ভেবে লোকলজ্জায়! কথাটা কতটা বিশ্বাসযোগ্য? 

মিতুর উশৃঙ্খল জীবনাচারের জন্য তিনি দায়ি করেছেন শাশুড়িকে। শাশুড়ি নাকী তার মেয়েকে আধুনিক বানাতে চেয়েছেন। সাত বছর প্রেমকালীনও কী মিতুর আধুনিকতা চোখে পড়েনি আকাশের? নাকী ভেবেছিলেন আমেরিকার গ্রীনকার্ডধারী মিতুকে বিয়ে করলে আখেরে তার অনেক লাভ হবে। তাই সাধ্যের বাইরে গিয়ে ৩৫ লাখ দেনমোহর দিয়ে মিতুকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু ওই ফাঁদেই পড়ে গেলেন তিনি। অত টাকা দিতে পারেননি বলে বাধ্য হয়ে স্ত্রীকে ছেড়ে দিতে পারেননি আকাশ। কেন সামর্থ্যরে বাইরে গিয়ে এত টাকা দেনমোহরে তিনি রাজি হলেন? সাধ্যের বাইরে দেনমোহর দেবার বিধান ইসলামে নেই। আর ইসলামে দেনমোহর প্রাপ্য হয় বিবাহ কার্যকর এবং সহবাস ঘটার পরই। তখনই দেনমোহরের  টাকা পরিশোধ করার নিয়ম। কিন্তু এদেশের খুব কম স্বামীই সেটা দিয়ে থাকেন। স্ত্রীরা  লজ্জায় চান না। দেনমোহরের প্রশ্ন ওঠে তালাকের প্রসঙ্গ এলেই । তার আগে নয়। আবার কায়দা করে পাত্রপক্ষ দেনমোহরের অর্ধেক উসুল দেখিয়ে দেন গহনাগাটি দেখিয়ে। বিবাহের গহনাগাটি কাপড় চোপড়  উসুলের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়া ঠিক নয়, এগুলি উপহার। উপহার কেন দেনমোহরে যাবে!

আকাশের স্ত্রী মিতুর ক্রিয়াকর্মকেও সমর্থন করছি না। তার যদি স্বামীকে ভালো না লাগে, স্বামীকে দিনের পর দিন না ঠকিয়ে তারও উচিত ছিলো স্বামীকে ত্যাগ করা। তাও আবার একজন নয় একাধিক পুরুষের সাথে ব্যভিচার করেছেন তিনি। এটাও অসুস্থতার লক্ষণ।

তিনি নাকী পরিবারের চাপে আকাশকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন! আকাশের সঙ্গে সংসার করার কোন  ইচ্ছে তার ছিল না। তিনি নিজে একজন ডাক্তার। পরিবারের উপর নির্ভরশীল তিনি নন।  তাছাড়া সাত বছর প্রেম করে জেনে শুনে আকাশকে বিয়ে করেছেন তিনি।  হতে পারে, প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন কিন্তু বিবাহিত জীবনে এসে  যে কোন কারণেই হোক আকাশকে ভাল লাগেনি। তা তিনি তাকে ডিভোর্স দেননি কেন? তিনিও কি তবে দেনমোহরের টাকা পাবার আশায় বসে ছিলেন? 

আমাদের সমাজে নানা কারণেই নারী পরপুরুষে আসক্ত হয়। সে কারণগুলি কখনই আলোচিত হয় না। কোন নারীর পরপুরুষে আসক্তি মানেই বিষয়টা অন্যায়, লজ্জার সমাজের জন্য ক্ষতিকর এটা আমরা ধরেই নেই। আর পুরুষের পরনারী আসক্তি যেন অনেকটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। আসক্তির কথা জেনেই স্ত্রীরা সংসার করে যায় । পরপুরুষে আসক্ত স্বামীর অনুগতও থেকে যায়। যারা প্রতিবাদ করেছে তাদের অনেককেই  জীবন দিতে হয়েছে। যেমন সালেহা,  শারমিন রিমা হত্যার কথা আমরা জানি। এ সমাজ চায় নারী মুখ বুজে সব সহ্য করুক। সে সংসারে সুখি হলেও সুখি থাকুক, না হলেও সুখি হবার ভান করুক। যেন কোনক্রমেই প্রতিবাদ না করে। 

অনেক নারী আছেন যারা বিয়ের রাতেই বুঝে যান স্বামীর অক্ষমতা। কিন্তু স্বামীর অক্ষমতার কথা  প্রকাশ করেন না।  এ লজ্জা যেন স্বামীর নয়, তার নিজের। ওই স্বামী নিয়েই তারা জীবন কাটিয়ে দেন। এই নারীদের ত্যাগের কথা কিন্তু কখনই আলোচিত হয় না। এদের নিয়ে কেউ ভাবেও না।

প্রেম আর বিয়ে নিয়ে দশ বছরের জানাশুনা আকাশ-মিতুর। উভয়কে চেনার জন্য এটা  যথেষ্ট সময় । স্ত্রীর প্রতি আকাশের ১০০% ভালবাসার ব্যাপারটা তিনি নিজেই অবিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন স্ত্রীর পরপুরুষের সাথে ছবি পোস্ট দিয়ে ।  বরং ১০০% প্রতিশোধস্পৃহাই প্রকাশিত হয়েছে এ ঘটনায়। 

আমরা ভুলে যাই ঘটনার পেছনেও ঘটনা থাকে। সে ঘটনা উন্মোচনের কোন চেষ্টা আমাদের থাকে না।  আমরা সবকিছুই সুপারফিশিয়ালি দেখি । তাই অনেক অপরাধের মূলোৎপাটন হয় না। অনেক নির্দোষ মানুষ শাস্তি পায়, দোষি ছাড়া পেয়ে যায়।

স্ত্রীকে হয়ত একসময়  ভালবাসতেন।  কিন্তু সে ভালবাসার কিছুই আর অবশিষ্ট ছিল না।  পুরোটাই রূপান্তরতি  হয়েছিল সাজা দেবার জন্য আত্মসংহারি ইচ্ছায় । তাই তিনি আত্মহত্যা করেছেন। যা  ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় অপরাধ।  তিনি  কিশোর নন যে,  আবেগপ্রবণ হয়ে আত্মহত্যা করে ফেলেছেন। তিনি করেছেন এই আশায় যে, মিতুর মারাত্মক কোন সাজা হবে।  

আকাশ মিতু কেউ কারো প্রতি কোনো সুবিচার করেনি। ওরা দুজনই ডাক্তার, দুজন মানসিক রোগি। এমন অনেক ডাক্তার আছে সমাজে যারা নিজেরাই মানসিক রোগে আক্রান্ত।  এদের কাছে রোগিরা বড়ই অনিরাপদ। সুস্থ ছেলেরা ডাক্তারি পেশায় আসুক এটাই আমাদেও প্রত্যাশা। তাই ডাক্তারি পেশায় প্রবেশের ব্যাপারে মানসিক সুস্থতার বিষয়টি সঠিকভাবে যাচাই করার জোর দাবি জানাচ্ছি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে।   

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর