আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে সায়িদ হাসান টিপুর স্মৃতিচারণ

আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে সায়িদ হাসান টিপুর স্মৃতিচারণ

বিনোদন ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২২:২৫ ৩ এপ্রিল ২০২০  

আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে সায়িদ হাসান টিপু। ছবি: লেখকের ওয়াল থেকে

আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে সায়িদ হাসান টিপু। ছবি: লেখকের ওয়াল থেকে

সঙ্গীতজ্ঞ আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করলেন অবসকিউর-এর সায়িদ হাসান টিপু। শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টায় তার ফেসবুকে স্মৃতিচারণমূলক লেখাটি পোস্ট করেন। ডেইলি বাংলাদেশ-এর পাঠকদের জন্য সেটি প্রকাশ করা হলো।

‘সারগাম ছিল হাজার মানুষের মিলনমেলা। যারা গান গাইতে বা বাজাতে পারত আর যারা পারত না দুই ধরনের মানুষেরই যাতায়াত ছিল সেখানে। প্রথম অ্যালবাম এর কাজ শেষ করে অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরেছিলাম তাই দ্বিতীয় অ্যালবাম এর কাজ এক বছর পরে ধরেছি। এইবার সারগাম আমাদের একলাফে তিন লাখ টাকা দিতে চেয়েছে, বারো হাজার থেকে ৩ লাখ, বোঝাই যায় প্রথম অ্যালবামে কী ব্যবসা হয়েছিল। জন বালা তখন ব্যান্ডে নেই, গিটারিস্ট এর অভাবে হিমশিম খাচ্ছি আমরা। এগিয়ে এলেন ফিডব্যাক এর লাবু ভাই, দ্বিতীয় অ্যালবাম অবস্‌কিওর ভলিউম-২ এর সব গান ওনার বাজানো। এই লাবু ভাই আর ফিডব্যাক, সাবা তানি আর শেখ ইশতিয়াক ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের অভাবনীয় একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ধীরে ধিরে।সে আরেক গল্প।

বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় অবস্‌কিওরের প্রথম অ্যালবাম এর সময়, ১৯৮৬ সালে। সারগাম এ দেখা, পরিচয় আর হৃদ্যতা। আমাদের অ্যালবাম এর পর সারগামে প্রায় প্রতিদিন যেতাম, নানা রঙের নানা বর্ণের মানুষের সঙ্গে দেখা হতো। সময়ে কেউ কেউ অনেক রঙ বদলেছেন আর কেউ কেউ সেই একই রকম আছেন এখনো। বাদল ভাই সারাদিন হাতে একটা অ্যাকুস্টিক গিটার নিয়ে তিরিং বিরিং টাইপ এর আওয়াজ করে যেতেন। গিটার শিখছেন উনি তখন। একদিন সারগামে ঢুকেছি, বাচ্চু ভাই আমাকে দেখে বললেন, তোকেই খুঁজতেসি। চিটাগাং এ শো করবি একটা? দশ হাজার টাকা পাবি। অবস্‌কিওরের জীবনের প্রথম শো যেটাতে আমরা টাকা পাবো। সঙ্গে সঙ্গে রাজী। চিটাগাং এ যাবার ট্রেন ভাড়া, পিএ সিস্টেম আর যন্ত্রপাতি ভাড়াতেই প্রায় সব টাকা চলে যাবে, তাতে কী। জীবনের প্রথম শো। কমলাপুর পৌঁছে আমরা সেই ভারী ভারী এসপি ২, ড্রামস, কিবোর্ড, গিটার সব নিজেদের ঘাড়ে করে নিয়ে অনেকটা হেঁটে ট্রেন এ উঠেছিলাম কারন কুলীর ভাড়া দিলে কোন টাকাই আর থাকে না। মনে নেই তবে শো টা করে কিছু টাকাও বাঁচিয়েছিলাম আমরা।

বাচ্চু ভাইয়ের শো ঢাকায় পাবলিক লাইব্রেরিতে। দেখতে গেছি, যাবার পর জানা গেল ওনার গিটার নেই, কী ঝামেলা কে জানে। মিরপুরে তখন আমার জানের দোস্তো ফাহিম থাকে, ও উইনিং এ বাজায়। এই সেই ফাহিম যার কারনে আমি গানে এসেছি আর এখনো গেয়ে যাচ্ছি। ওর কাছে তখন বাংলাদেশের প্রথম "Flying V" গিটার আছে একটা। বুলেটের মত স্কুটার নিয়ে ফাহিমের কাছে গেলাম। ও কোনো কিছু না জিজ্ঞাসা করে দিয়ে দিল গিটারটা আমাকে। ফেরত এসে বাচ্চু ভাইকে দিলাম গিটার। শো চলল আর এই প্রথম ওনার গলায় বিজি'স এর ট্র্যাজেডি শুনলাম।যে শুনেছে সে জানে কত কাছাকাছি যেতে পারতেন উনি।

শামসুন্নাহার হলের পাশে আমাদের প্যাড, বেশ অনেকদিন ওখানেই চলছে আমাদের পিটাপিটি। এর মাঝে আমাদের নতুন সব যন্ত্রপাতি আমি নিজে যেয়ে নিয়ে এসেছি। একটা Fender telecaster, একটা stratocaster,TNT Bass amp,Ibanez Bass Guitar,Roland D50 আর 18piece এর Tama Rockstar Drums। যন্ত্রে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ তখন। বাচ্চু ভাই একদিন বললেন, টিপুরে, নতুন ব্যান্ড করেছি, তোদের প্যাডটা প্র্যাকটিস এর জন্য দিবি? মাথা হেলিয়ে হ্যা বললাম,LRB প্র্যাকটিস শুরু করলো আমাদের ওখানে।

একদিন নটরডেম কলেজের উল্টোপাশে বাচ্চু ভাইয়ের শো।কি কাজে আমি গ্যাছি,ষ্টেজ এ ডাকলেন, তোর মাঝরাতেটা গা তো। বললাম আপনাদের সঙ্গে তো তোলা নেই, বলে তুই গা, আমি বাজাচ্ছি। এই জীবনে মাঝরাতে চাঁদ তো গাইতেই আছি কিন্তু ওইদিন আমার সঙ্গে উনি যা বাজিয়েছিলেন সেটা এখন পর্যন্ত আর কোনো গিটারিস্ট এর হাত থেকে বের হয়নি।

সিলেটে যাচ্ছেন বাচ্চু ভাই, আমাকে বললেন, তুই চল আমার সঙ্গে। কেন বাচ্চু ভাই? ওখানে অনেক গান গাইতে হবে তুই সাপোর্ট দিবি, হারমনি করবি। গেলাম চলে। শো'র সময় ভুল করে হারমনি সহ মেইন লাইনও গাইতে থাকলাম। বিরতি তে দিলেন বকা, তুই সব গাইলে আমি গাইবো কিরে?

অনেক পরে আমরা মগবাজারে একই গলিতে থাকতাম, গাড়ি নিয়ে ঢুকতে বা বেরোতে দেখা হয়ে যেত মাঝেমাঝে। কাঁচ নামিয়ে চেঁচাতেন, আসিস না কেন?

LRB'র কোন এক বর্ষপূর্তির আগে ফোন দিলেন, গুলশানে রেস্টুরেন্ট এ চলে আসিস, শাওনকে অবশ্যই আনবি। কোন এক অজ্ঞাত কারনে শাওন ওনার ভীষণ আদরের ছিল। দেখা হলেই বুকে টেনে নিতেন। গেলাম একটু দেরি করে, অনেক মানুষ। আমাকে দেখেই বগলদাবা করে চেঁচালেন, সবাই একটু চুপ করো। সব চুপ, বলা শুরু করলেন এই যে টিপু যার কারনে আজ LRB যেখানে আছে, সেখানে।আমি আর LRB gratitude জানতে চাই ওকে।আমি মাটিতে মিশে যাই পারলে।

চ্যানেল আই এর ব্যান্ড ফেস্ট, প্রথম থেকেই আমরা আছি। খালি ফোন করে বলেছেন, সাগর ভাইয়ের কাছ থেকে এই দিনটা আমি চেয়ে নিয়েছি, তোদের থাকতে হবে।এই আর একটা মানুষ যিনি কোনদিন আমার কোন কথা রাখেননি তা হয়নি আবার আমিও ওনার কোনো কথার অবাধ্য কখনো হয়েছি বলে মনে পরে না।

ব্যান্ড ফেস্ট এর আগে আমি কলকাতায় যাচ্ছি, ফোন দিয়ে বললাম, এবার অনেক গুছিয়ে করতে চাই বাচ্চু ভাই। বললেন আয় একদিন প্ল্যান করে নেবো। ওটাই শেষ কথা ছিল ওনার সঙ্গে। আমি ফিরে এসে ব্যস্ততার কারনে আর যোগাযোগ করিনি, প্রতিদিনই ভাবছি যাবো, যাওয়া হয়ে ওঠেনি। যদি জানতাম উনি চলে যাবেন তাহলে হয়ত যেয়ে জড়িয়ে ধরে থাকতাম শক্ত করে। ব্যান্ড ফেস্ট হলো কিন্তু বাচ্চু ভাইকে স্মরণ করে, এমন ফেস্ট আমি চাইনি ভাই, ওখানে বাজাতে ভালো লাগেনা আর।

**এই ছবিটা কোন এক ব্যান্ড ফেস্ট এ তোলা। ওনার আজব এক স্বভাব ছিল,কাউকে দেখলেই ডেকে বলতেন আয় ছবি তুলি আর ছবি তুলতে দাঁড়িয়ে যেতেন। এদেশের অর্ধেক মানুষের মনে হয় ওনার সঙ্গে ছবি আছে। এইটা আমারো করার খুব ইচ্ছা জাগে কিন্তু মনে থাকে না।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর