Alexa আইনের ফটকের সামনে

আইনের ফটকের সামনে

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:২০ ৩০ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ২১:৩০ ৩০ অক্টোবর ২০১৯

ছবি: আন্তর্জাল

ছবি: আন্তর্জাল

আইনের ফটকের সামনে বসে ছিল একজন দ্বাররক্ষী। গ্রাম থেকে আগমন করা এক লোক এসে তার কাছে আইনে প্রবেশাধিকার চাইল। কিন্তু দ্বাররক্ষী তাকে জানালো যে, এই মূহূর্তে সে তাকে প্রবেশ করতে দিতে পারবে না। লোকটি একটু চিন্তা করে জানতে চাইল যে, পরবর্তীতে আসলে তাকে প্রবেশ করতে দেয়া হবে কিনা। ‘সেটা সম্ভব’, দ্বাররক্ষী জানাল, ‘তবে এখন সম্ভব নয়।’

তাদের কথোপকথনের সময়েও ফটকটি খোলা ছিল। দ্বাররক্ষী একটু পাশে সরে গেলে লোকটি নীচু হয়ে ফটক দিয়ে ভেতরে দেখার চেষ্টা করল। দ্বাররক্ষী বিষয়টা খেয়াল করে হাসতে হাসতে তাকে বলল, ‘তোমার যদি দেখার এতই ইচ্ছে হয়ে থাকে, তাহলে আমার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করতে পার। কিন্তু মনে রেখ যে, আমি খুবই শক্তিশালী। তবে দ্বাররক্ষীদের মধ্যে আমিই সবচেয়ে কম ক্ষমতাধর। এই ফটক অতিক্রম করার পর কিন্তু কক্ষ থেকে কক্ষান্তরে যেতেও তোমাকে ফটক অতিক্রম করতে হবে। প্রতিটা ফটকেই দ্বাররক্ষী রয়েছে, যারা একজনের চেয়ে অন্যজন বেশী ক্ষমতাধর। তাদের দৃষ্টির তীব্রতাকে সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই।’

গ্রামের লোকটি এই ধরনের সমস্যায় পড়বে তা ভাবেনি। সে ভেবেছিল যে, আইনের দ্বার সবার জন্যেই উন্মুক্ত থাকে। কিন্তু এখানে আসার পর সে নিবিড়ভাবে দ্বাররক্ষীর ফারের তৈরি কোট, তার খাঁড়া নাক এবং তার দীর্ঘ কাল তাতার শ্মশ্রুর দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল যে, ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পাবার পূর্ব পর্যন্ত অপেক্ষা করাই তার জন্যে শ্রেয় হবে।

দ্বাররক্ষী ফটকের সামনে লোকটিকে বসার জন্যে একটি টুল দিল। টুলের উপরে সে দিনের পর দিন, এমনকি অনেক বছর কাটিয়ে দিল। ভেতরে প্রবেশের জন্যে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করল। এমনকি দ্বাররক্ষীকেও বারংবার অনুরোধ করল। দ্বাররক্ষী প্রায়ই তাকে তার বাসস্থান ও অন্যান্য বিষয়ে বিভিন্ন ধরণের প্রশ্ন করত, কিন্তু সেগুলো গতানুগতিক ও অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন ছাড়া কিছুই ছিল না। কারণ, প্রতিবারেই সে লোকটিকে শেষ পর্যন্ত জানাতো যে, তার পক্ষে প্রবেশাধিকার দেয়ার সময় তখনো হয়নি।

লোকটি যা কিছু সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল–মূল্যবান বা মূল্যহীন, তার সবগুলো বিক্রি করে দ্বাররক্ষীর মন জয় করার চেষ্টা করল। প্রতিটা সময়েই দ্বাররক্ষী তার দেয়া উপহারগুলো গ্রহণ করত। কিন্তু বলত, ‘আমি জিনিসগুলো তোমার কাছ থেকে এজন্যে নিচ্ছি যে, যাতে তোমার মনে না হয় যে, তুমি তোমার চেষ্টায় ত্রুটি করেছ।’

এভাবে অনেক বছর পর্যন্ত লোকটি দ্বাররক্ষীকে ক্রমাগতভাবে তুষ্ট করার চেষ্টা চালিয়ে গেল। একসময়ে সে প্রবেশদ্বারের ভেতরের অন্য সব দ্বাররক্ষীদের কথা ভুলে গেল এবং এই দ্বাররক্ষীকেই শুধুমাত্র তার আইনে প্রবেশের অন্তরায় বলে মনে করল। প্রথমদিকের বছরগুলোতে সে উচ্চকণ্ঠে নিজের দুর্ভাগ্যকে অভিশাপ দিত। কিন্তু বৃদ্ধ হয়ে যাবার পর সে শুধু নিজের সাথে বিড়বিড় করত। আস্তে আস্তে সে ছেলেমি আচরণ করা শুরু করে দিল। যেহেতু অনেক বছর যাবত সে দ্বাররক্ষীর সাথে তার প্রতিনিয়ত দেখা হচ্ছিল, দ্বাররক্ষীর জামার কলারের মাছিগুলোর সাথেও সে পরিচিত হয়ে গিয়েছিল। এই মাছিগুলোকেও সে অনুরোধ করত যাতে তারা তার পক্ষ হয়ে দ্বাররক্ষীকে অনুরোধ করে।

অবশেষে এক সময়ে তার চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে আসল। সে আর বুঝতে পারত না যে, তার চারপাশে আসলেই অন্ধকার, নাকি তার চোখ তাকে ফাঁকি দিচ্ছে। তবে শেষদিকে অন্ধকারের ভেতরে সে অনির্বাণ এক আলোক শিখা দেখতে পেত, যা আইনের প্রবেশদ্বার দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত।

তার জীবন আর বেশীদিন অবশিষ্ট ছিল না। সুতরাং মৃত্যুর পূর্বে সে মাথার ভেতরে তার সারাজীবনের অভিজ্ঞতাকে একত্রিত করে দ্বাররক্ষীকে একটা প্রশ্ন করার জন্যে মনঃস্থির করল। এই প্রশ্ন সে কখনই তাকে করেনি। ইশারা দিয়ে সে দ্বাররক্ষীকে কাছে ডাকল। কারণ তার অবশ হয়ে যাওয়া শরীরকে উত্তোলনের সামর্থ তার ছিল না।

দ্বাররক্ষীকেও নিচু হয়ে তার সাথে কথা বলতে হল। কারণ লোকটি আসলেই অক্ষম হয়ে গিয়েছিল। ‘তুমি এখনও কি জানতে চাও?’ দ্বাররক্ষী তাকে জিজ্ঞেস করল। ‘তুমি দেখি খুবই অতৃপ্ত ধরণের মানুষ।’

‘সবাই আইনের আশ্রয় লাভ করতে চায়’, লোকটি বলল। ‘তাহলে এটা কি করে সম্ভব যে, আমি ছাড়া আর কেউই এই ফটকে এসে আইনে প্রবেশাধিকার চায়নি?’

দ্বাররক্ষী দেখল যে, লোকটার মৃত্যুর সময় প্রায় উপস্থিত। তার শ্রুতিশক্তি দ্রুত লোপ পাচ্ছে। সুতরাং সে চিৎকার করে তাকে বলল, ‘এই ফটক দিয়ে আর কেউ প্রবেশ করতে আসবে না। কারণ এটি শুধুমাত্র তোমার জন্যে নির্ধারিত ছিল। আমি এখন এটাকে বন্ধ করে দিচ্ছি।’

মূল: ফ্রানজ কাফকা

ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই