অসুস্থতা এবং পেরেশানিও একটি নেয়ামত (শেষ পর্ব)

অসুস্থতা এবং পেরেশানিও একটি নেয়ামত (শেষ পর্ব)

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:১৮ ১৬ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১৭:৫৭ ১৬ জুলাই ২০২০

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং এর ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং এর ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

কোনো কোনো বুজুর্গ থেকে বর্ণিত আছে যে, তারা বিপদ-আপদে খুব হায় হায় করতেন। কষ্ট প্রকাশ করতেন। বাহ্যিকভাবে মনে হয় বিপদ-আপদে হায় হায় করা এবং কষ্ট প্রকাশ করা ধৈর্যহীনতা। আল্লাহ তায়ালার বিরুদ্ধে অভিযোগ যে, আমাকে কেন বিপদ-আপদ দেয়া হলো! 

আরো পড়ুন >>> অসুস্থতা এবং পেরেশানিও একটি নেয়ামত (পর্ব-৩)

বিপদ-আপদে অধৈর্য হওয়া বা অভিযোগ করা ঠিক না। এর উত্তরও আলোচ্য হাদিস থেকে জানা যায়। আল্লাহ তায়ালার নেককার ও মকবুল বান্দারা অভিযোগের মতো করে কষ্ট প্রকাশ করেন না। তারা বরং মনে করেন, আমাকে বিপদ-আপদ দেয়াই হয়েছে এ জন্য যে, আমি আল্লাহ তায়ালার সামনে নিজের অসহায়ত্ব, অক্ষমতা ও হীনতা প্রকাশ করি। দুঃখ-কষ্টে হায় হায় করি। আমাকে দুঃখ-কষ্ট দেয়ার অর্থ হলো, আল্লাহ তায়ালা আমার আহাজারি শোনতে চান। তাই এক্ষেত্রে বাহাদুরি প্রকাশ করা মোটেই ঠিক না।

একজন বুজুর্গের ঘটনা:

আমার আব্বাজান হজরত মুফতি মোহাম্মদ শফি (রহ.) এর কাছ থেকে শুনেছি। একবার এক বুজুর্গ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অন্য একজন বুজুর্গ তাকে দেখতে গেলেন। গিয়ে দেখলেন, অসুস্থ বুজুর্গ আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ’র জিকির করছেন। তিনি তাকে বললেন, আপনার এই আমল খুবই ভালো। আপনি আল্লাহ তায়ালার শোকর আদায় করছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে সামান্য হায় হায়ও করুন। যতক্ষণ পর্যন্ত হায় হায় না করবেন, আপনি সুস্থ হবেন না। কারণ আল্লাহ তায়ালা আপনাকে রোগ এই জন্য দিয়েছেন যে, আল্লাহ তায়ালার সামনে আপনি কান্নাকাটি করেন, তাঁর সামনে নিজের অসহায়ত্ব, অক্ষমতা ও হীনতা প্রকাশ করেন। আল্লাহ তায়ালার সামনে বাহাদুরি দেখাবেন না। বলুন, হে আল্লাহ! আমি দুর্বল ও অক্ষম। আমি এই রোগ-ব্যাধি সহ্য করতে পারছি না। আমার এই রোগ দূর করুন।

একটি শিক্ষণীয় ঘটনা:

হজরত থানবি (রহ.) এক বুজুর্গের ঘটনা লিখেছেন। একবার বিশেষ কোনো অবস্থায় আল্লাহ তায়ালাকে উদ্দেশ্য করে তার মুখ থেকে নিম্মোক্ত বাক্যটি বেরিয়ে যায়,

ليس لي في سواك حظ
فكيف ما شئت فاختبرني

‘হে আল্লাহ! আপনি ব্যতীত অন্যকারো মাঝে, অন্যকোনো কাজে আমি মজা পাই না। আপনি যেভাবে ইচ্ছা আমাকে পরীক্ষা করে দেখুন। (আল্লাহর পানাহ)।

উপরিউক্ত পঙ্ক্তি আল্লাহ তায়ালাকে পরীক্ষা করার আহ্বানে জানানো হয়। কিছুক্ষণ পর তার পেশাব বন্ধ হয়ে যায়। মূত্রথলী পেশাবে ভরে যায়। কিন্তু বের হওয়ার রাস্তা পায় না। কয়েকদিন এই অবস্থায় অতিবাহিত হয়। এরপর তার হুশ হয়, কত মারাত্মক কথা আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে। সে বুজুর্গের কাছে ছোট ছোট বাচ্চারা পড়ার জন্য আসত। তিনি বাচ্চাদেরকে বলেন, তোমরা তোমাদের মিথ্যাবাদী চাচার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া কর, যাতে আল্লাহ তায়ালা আমাকে এই রোগ থেকে মুক্তি দান করেন। কারণ তিনি মিথ্যা দাবি করেছিলেন। আল্লাহ তায়ালা দেখিয়ে দিয়েছেন, তুমি দাবি করেছ কোনো জিনিসে তুমি মজা পাও না। আরে, তুমি তো পেশাব করে মজা পাও। আল্লাহ তায়ালার সামনে বাহাদুরি চলে না।

মসিবতে রাসূল (সা.) এর অনুসৃত পন্থা:

বিপদ-আপদে আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে না আবার বাহাদুরিও প্রকাশ করবে না। বরং উভয়ের মধ্যবর্তী ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা ও সুন্নত তরিকা অবলম্বন করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যু শয্যায় যখন খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন, হজরত আয়েশা (রাদি.) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বারবার পানিতে হাত ভিজাচ্ছিলেন। তারপর ভেজানো হাত মুখের ওপর বুলাচ্ছিলেন। কষ্ট প্রকাশ করছিলেন। হজরত ফাতেমা (রাদি.) এ অবস্থা দেখে বলে উঠেন,

واكرب اباه

আমার আব্বাজানের কত কষ্ট হচ্ছে! এর উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

لا كرب ابيك بعد اليوم

আজকের পরে তোমার পিতার কোনো কষ্ট থাকবে না। (সহিহ বুখারি, সুনানে ইবনে মাজাহ)।

দেখুন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুশয্যায় কষ্ট প্রকাশ করেছেন কিন্তু অভিযোগ করেননি। বরং ভবিষ্যতে আরাম ও শান্তি পাবেন বলে ইঙ্গিত করেছেন। এটাই সুন্নত তরিকা। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুত্র হজরত ইব্রাহিমের ইন্তেকাল হয়, তখন তিনি বলেন,

وَإِنَّا بِفِرَاقِكَ يَا إِبْرَاهِيمُ لَمَحْزُونُونَ

ইব্রাহিম, তোমার বিচ্ছেদে আমরা অবশ্যই ব্যথিত। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেয়ে হজরত যয়নবের শিশুসন্তানকে তিনি কোলে নিয়ে বসে আছেন। তার কোলেই শিশুসন্তানের ইন্তেকাল হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের চোখ বেয়ে অশ্রু নেমে আসে। যেন তিনি অশ্রুর ভাষায় বলছিলেন, হে আল্লাহ! আপনার ফয়সালা সত্য ও সঠিক। কিন্তু আপনি এ জন্যই কষ্ট দিয়েছেন যে, আমি আপনার সামনে অক্ষমতা প্রকাশ করি। অশ্রুপাত ও আহাজারি করি। (সুনানে ইবনে মাজাহ)। 

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং এর ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে