Alexa অলিম্পিকে ভালো করাই লক্ষ্য রোমান সানা’র

অলিম্পিকে ভালো করাই লক্ষ্য রোমান সানা’র

এস আই রাসেল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:৩৪ ১২ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ২০:৫৩ ১২ অক্টোবর ২০১৯

আরচ্যার রোমান সানা

আরচ্যার রোমান সানা

বাংলাদেশের ইতিহাসে টুর্নামেন্টের মাধ্যমে সরাসরি অলিম্পিকে খেলার যোগ্যতা অর্জনকারী প্রথম অ্যাথলেট খুলনার ছেলে রোমান সানা। অন্যান্য দিক বিবেচনায় দ্বিতীয় অ্যাথলেট এই আরচ্যার। এশিয়া কাপ র‌্যাংকিং টুর্নামেন্টে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে জিতেছেন সোনা। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের রিকার্ভ পুরুষ এককেও অর্জন করেছেন ব্রোঞ্জ। স্কুল জীবনে ক্রিকেট-ফুটবল ভালো খেলা খেলোয়াড়টি আজ বিশ্ব আরচ্যারীতে বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরেছেন। 

রোমান ১৯৯৫ সালের ৮ জুন খুলনার কয়রায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আবদুল গফুর সানা ও মাতা বিউটি বেগমের তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট রোমান সানা। ২০১০ সালে বাংলাদেশ জাতীয় আরচ্যারী দলে অভিষেক হয় তার। 

আরচ্যারীতে আসা, অলিম্পিকে কোয়ালিফাই, এশিয়া কাপে স্বর্ণ জয়, অলিম্পিকের প্রস্তুতি সম্পর্কে ডেইলি বাংলাদেশকে নিজের অভিব্যাক্তি ব্যক্ত করেছেন এশিয়ার সেরা এ আরচ্যার।

রোমার সানা বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে আমিই প্রথম টুর্নামেন্টের মাধ্যমে সরাসরি অলিম্পিকে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছি। আমার আগে গলফার সিদ্দিকুর ভাই সরাসরি খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে তা র‍্যাংকিং ভিত্তিক ভাবে। টুর্নামেন্ট আকারে না। আরচ্যারী ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল অলিম্পিকে সরাসরি কোয়ালিফাই করার। আল্লাহর রহমতে তা সম্ভব হচ্ছে।

অলিম্পিকে সরাসরি সুযোগ পাওয়া আমার জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অর্জন। আমি আশা করছি আগামী দিনগুলো আরো ভালো যাবে। যেহেতু আমার পঞ্চাশ শতাংশ স্বপ্নপূরণ হয়েছে তাই অলিম্পিকের জন্য আরো সাহস পাচ্ছি।

কিভাবে আরচ্যারীতে আসা, আরচ্যারী সম্পর্কে জানলেন কিভাবে?

আমি ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট ও ফুটবলে বেশ ভালো ছিলাম। ২০০৮ সালে ক্লাস নাইনে থাকার সময় আমার স্কুল শিক্ষক আরচ্যারী সম্পর্কে আমাকে প্রথম জানান। হাসান স্যার আমাদের জানান আরচ্যারী নামে একটা খেলা আছে। আমরা কেউ চাইলে খেলায় অংশ নিতে পারি। পরের দিন স্যারের সঙ্গেই খুলনা স্টেডিয়ামে গিয়ে দেখি বাঁশের ধনুক, তীর, বোর্ড। এ ভাবেই আরচ্যারীতে আসা। 

খুলনার বাছাই পর্বে ৪০ জনকে টপকে এক নম্বর হলাম এবং ঢাকায় এসে  ক্যাম্পেইনে যোগ দেই। এভাবেই আরচ্যারীতে যাত্রা শুরু। দুই বছরের মাথায় ২০১০ সালে আরচ্যারী জাতীয় দলে সুযোগ পেলাম। সেই থেকে এখন পর্যন্ত চলছে আরচ্যারী ক্যারিয়ার। ২০১১ সালে বিকেএসপিতে ইউথ আরচ্যারী চ্যাম্পিয়নশিপ নামে প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলি। প্রথম টুর্নামেন্টেই সিলভার মেডেল জয়ী হই আমি।

ফেডারেশনের কার্যক্রমে আপনি কতটুকু সন্তুষ্ট? 

শুরু থেকেই ফেডারেশন আমাদের শতভাগ দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সারাবছরই আমাদের অনুশীলন চলে। দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন বড় বড় টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করি। ফেডারেশন ও এমন টুর্নামেন্ট আয়োজন করে। আমাদের ফেডারেশন দেশের অন্য ফেডারেশনগুলোর জন্য রোল মডেল হয়ে উঠেছে। কারণ এত অল্প সময়ে দেশের আর কোনো ফেডারেশন এতো উন্নতি করতে পারেনি। আমরা সবাই সন্তুষ্ট ফেডারেশনের উপর। আশা করি ফেডারেশন এক সময় সবাইকে ছাড়িয়ে যাবে।

আরচ্যারীতে আপনার প্রত্যাশা কি?

আরচ্যারী ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই ইচ্ছে ছিল বিশ্বের সেরা আরচ্যারদের একজন হয়ে ওঠার। বেডি এলিসন, জিমও জিন, লিও শেখ এদোর মতো হতে চেয়েছি। তারা বিশ্বে খুবই পরিচিত অ্যাথলেট। সাকিব আল হাসান, মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা যেমন সারাবিশ্বে জনপ্রিয়। আমারও স্বপ্ন ছিল তাদের মত জনপ্রিয় হওয়ার। আর ভালো কোনো টুর্নামেন্ট থেকে সলফতা পেলে একদিন আমিও তাদের মতো হয়ে উঠবো। এটা আমি বিশ্বাস করি। আশা করি অলিম্পিকে দেশকে একটা ভালো কিছু উপহার দিয়ে আমার সে স্বপ্ন পূরণ হবে।

প্রধানমন্ত্রী নিজ হাতে মিষ্টি খাইয়েছেন এবং আপনার সঙ্গে কি কথা হলো এ ব্যাপারে কিছু বলুন?

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার স্বপ্ন থাকে সবার। আমারও ছিল। এর আগেও তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে কথা বলার সুযোগ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী আমাকে ডেকেছেন, নিজ হাতে মিষ্টি খাইয়েছেন এর অনুভূতি আসলে প্রকাশ করা সম্ভব না। প্রধানমন্ত্রীর কথাবার্তায় আমি মুগ্ধ। 

প্রধানমন্ত্রী আমার খুঁটিনাটি সব জিজ্ঞাসা করেছেন। তিনি আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন কীভাবে খেলা শুরু করি। আমি তাকে আমার শুরুর গল্পটা বলায়, প্রধানমন্ত্রী হেসে বলেন ‘আমরাও ছোট বেলায় কুনচি দিয়ে সুতলি প্যাঁচিয়ে গুলতি মেরেছি, আরচ্যারী খেলেছি।’ 

প্রধানমন্ত্রী আমার পরিবারের সব খোঁজ খবর নেন। আমার আম্মুর চিকিৎসার দায়-ভার নেন। আমাকে আর্থিকভাবে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এছাড়াও আমাদের ফেডারেশনকেও সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

আপনার পরে আরচ্যারীতে ভালো করার মত কারা আছেন দলে?

আমাদের টিমে এখন অনেকেই আছে। আমাদের পাইপ লাইনে এখন বেশ কিছু খেলোয়াড় আছে। তামিমুল ইসলাম, রুবেল, সাকিব, আলী ও প্রদিপ্ত। এরা সবাই তৈরি হচ্ছেন। আমি যখন আরচ্যারীতে আসি তখন আমাদের মিলন ভাই সেরা খেলোয়াড় ছিলেন। আমি তাকে ফলো করতাম। এখন আমি সফলতা পাচ্ছি জুনিয়ররা আমাকে ফলো করে। আমাদের মধ্যে রুবেল অত্যন্ত ভালো খেলে।

আরচ্যারী ফেডারেশনে আপনার প্রেরণা কে?

আরচ্যারীতে আমার অনুপ্রেরণা আরচ্যারী ফেডারেশনে সাধারণ সম্পাদক কাজী রাজিব উদ্দিন আহমেদ চপল। তিনি আমাকে নিজের ছেলের মত ভালোবাসেন। তার আন্তরিকতায় অল্প সময়ে আরচ্যারী ফেডারেশন সফলতা পেয়েছে। তার কথাবার্তায় ভালো খেলার আগ্রহটা বাড়ে। 

আপনাদের উপর কোনো চাপ আছে?

চাপ তো থাকেই। তবে আমাদের উপর চাপ তৈরি হয় জুনিয়রদের খেলার কারণে। জুনিয়ররা ভালো খেললে তখন সিনিয়রদের চাপ বাড়ে। এটা ভাল। এতে সিনিয়রদের ভালো খেলার আগ্রহ বাড়ে।

অলিম্পিকের প্রস্তুতি সম্পর্কে কিছু বলুন... 

অলিম্পিকে সরাসরি খেলার সুযোগ পাওয়ার পর থেকে প্রস্তুতি শুরু করেছি। অলিম্পিকের আগে আরো বেশ কিছু ইভেন্ট পাচ্ছি। সেগুলোতে অলিম্পিকের প্রস্তুতিটা ভালোভাবেই সেরে নিতে পারব। এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও সাফ গেমসে নিজেকে ঝালিয়ে নেয়ার সুযোগ পাচ্ছি। বড় বড় টুর্নামেন্টগুলো যত বেশি খেলতে পারবো তত আত্মবিশ্বাস বাড়বে। 

ট্রেইনার ও কোচ নিয়ে আপনার বক্তব্য কি?

বিশ্বের নাম করা সেরা দশজন কোচের মধ্যে মার্টিন ফ্রেডরিক একজন। তিনি আসার পর থেকেই বাংলাদেশ আরচ্যারীর মোড় ঘুরে গেছে। তার সহযোগিতায় আমরা ভালো করছি। তিনি প্রায় সাত বছর চিলির প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগেও নিজ দেশে কোচিং করিয়েছেন জার্মান কোচ। 

মার্টিন ফ্রেডরিক প্রায় ৪৩ বছর ধরে আরচ্যারীর সঙ্গে যুক্ত। তিনি দীর্ঘ দিন নিজে খেলেছেন এখন কোচিং করাচ্ছেন। আমি এখন পর্যন্ত যত কোচের কাছে অনুশীলন করেছি তাদের মধ্যে মার্টিন ফ্রেডরিক সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞ ও তার আচার-আচরণ সবকিছুই প্রশংসনীয়। 

স্পন্সর নিয়ে কি কোনো সমস্যা দেখা দিচ্ছে?

আগের স্পন্সরে বেশ সমস্যা ছিল। তবে এখন তা কেটে গেছে। সিটি গ্রুপ আরচ্যারীতে হাত বাড়িয়ে দেয়ার পর থেকে ফেডারেশন বেশ ভালোই চলছে। আরচ্যারীতে ‘তীর গো ফর গোল্ড’ স্লোগানে সিটি গ্রুপ বেশ বড় একটা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছেন। আমরা অলিম্পিকে সরাসরি সুযোগ পাওয়ায় তাদের লক্ষ্য অনেকটাই পূরণ করেছি। তারা যদি এগিয়ে না আসতো তাহলে বড় ইভেন্টগুলোতে খেলতে কষ্ট হতো। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। তীর আমাদের স্পন্সর করায় এবারের এশিয়া কাপ স্টেজ থ্রিতে অংশ নিতে পেরেছি। তাদের মতো যদি অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আসে। ফেডারেশনকে সহযোগিতা করে। তাহলে আমরা আরো বেশি বেশি খেলতে পারব। আমি মনে করি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি এগিয়ে আসে তাহলে আমাদের আরচ্যারীর মত অন্য ফেডারেশনগুলোও দেশকে ভালো কিছু উপহার দিতে পারবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআরকে