অরুন্ধতী রায়ের বাংলাদেশ সফর থেকে পাওয়া
Best Electronics

অরুন্ধতী রায়ের বাংলাদেশ সফর থেকে পাওয়া

প্রকাশিত: ১৬:২১ ১৫ মার্চ ২০১৯   আপডেট: ১৮:৩৯ ১৬ মার্চ ২০১৯

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

বিতর্ক মানুষকে বিখ্যাত করে – এই আপ্তবাক্যটি অনেকেই খ্যাতিপ্রাপ্তির সোপান হিসেবে মনে করেন।

মৌলিক উন্নত মানের অথবা সাধারণ মানের কাজের সঙ্গে তারা সমাজ সংক্রান্ত এমন কিছু মতামত জাহির করেন যে তার পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তির ঝড় ওঠে। ক্রমেই তিনি বিখ্যাত হয়ে যান। এর ওপরে আবার যদি কোনো সরকারি নিষেধাজ্ঞা জোটে তবে তো সোনায় সোহাগা। সেই ব্যক্তির টিআরপি চড়তে থাকে চড়চড় করে। চ্যানেল ও কাগজ তার পিছনে ছুটতে থাকে।  মানুষ চট করে তার ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস থেকে তার খাদ্যাভ্যাস পর্যন্ত জেনে যান। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশে যা হলো লেখিকা অরুন্ধতী রায়কে নিয়ে। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের আমন্ত্রণে অরুন্ধতী রায় ঢাকায় গিয়েছিলেন। কথা ছিল কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশন কমপ্লেক্স মিলনায়তনে অতিথিদের সঙ্গে নিজের লেখক জীবন নিয়ে আলোচনা করবেন। বক্তৃতাদানের দিন সকালে বাংলাদেশ পুলিশ জানাল যে অরুন্ধতী রায়ের বক্তৃতা অনুষ্ঠান বাতিল। পরে অবশ্য তিনি ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে বক্তৃতা করলেন।

বেশ কিছুদিন আগে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে হওয়া আন্দোলনকে সমর্থন করায় জেলে যেতে হয়েছিল আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে। যার নিন্দা হয় সর্বত্র। অরুন্ধতী রায়ও তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন এই গ্রেফতারির।  অরুন্ধতী রায় একজন আলোচিত লেখক, বুদ্ধিজীবী ও অ্যাক্টিভিস্ট। ঔপন্যাসিক হিসেবে উঠে এলেও পরবর্তীকালে রাজনৈতিক প্রবন্ধ, বক্তব্য ও অ্যাক্টিভিজমের মাধ্যমে তিনি বেশি আলোচিত হন। ২০১৪ সালের ১ মার্চ ক্যারাভান ম্যাগাজিনে অরুন্ধতী রায় মহাত্মা গান্ধীর কঠোর সমালোচনা করে পুস্তিকা আকারের দীর্ঘ একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। রায়ের লেখাটির শিরোনাম ছিল দ্য ডক্টর অ্যান্ড দ্য সেইন্ট: আম্বেদকর, গান্ধী অ্যান্ড দ্য ব্যাটল অ্যাগেইনস্ট কাস্ট। লেখাটি রায় মূলত লিখেছিলেন আম্বেদকরের আলোচিত রচনা দি অ্যানহাইলেশন অব কাস্ট-এর ভূমিকা হিসেবে। অরুন্ধতী তার ভূমিকায় গান্ধীকে বর্ণ প্রথার একজন সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করে দলিতদের নেতা বাবাসাহেব আম্বেদকরকে মহিমান্বিত করেছেন। লেখাটি ইতিহাস, রাজনীতি নিয়ে আগ্রহীদের মধ্যে সাড়া জাগায়, বিশেষত বামপন্থী মহলে দারুণভাবে আদৃত হয়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইতিহাসবিদ এমএসজি নারায়ণান অরুন্ধতীর সমালোচনায় তার ভাষা কঠোর করেছেন, তিনি রায়কে মিডিয়াবান্ধব পপুলিস্ট হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ‘গান্ধীকে বর্ণ প্রথার বাহক বলে অরুন্ধতী রায় হয়তো একদল চরমপন্থীর নায়ক হতে চাইছেন কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি মানুষের ন্যায়বোধের চেতনাকে আহত করছেন। তিনি হয়তো মিডিয়া ও টিআরপি-ক্ষুধার্ত টেলিভিশন চ্যানেলে ঝড় তুলতে সক্ষম হয়েছেন...ভারত ও দুনিয়ার মানুষ জানে কে গরিব এবং প্রান্তিক মানুষের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করেছিলেন। 

গান্ধীর সঙ্গে অনেক মতপার্থক্য থাকলেও আম্বেদকর অনেক জায়গায় উল্লেখ করেছেন, সমাজের প্রান্তিক ও নিম্নবর্ণের মানুষের মুক্তির বিষয়ে কোনো বিতর্ক সম্ভব ছিল না, যদি গান্ধী ভারতের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জমিনে সক্রিয় না হতেন।

অরুন্ধতী রায় তার প্রথম উপন্যাস দ্য গড অব স্মল থিংস-এর জন্য ১৯৯৭ সালে বুকার পুরস্কার পেয়েছিলেন। বইটি প্রকাশ হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। এ বই ও বুকার পুরস্কারই অরুন্ধতীকে সেলিব্রেটি মর্যাদা এনে দিয়েছিল। এরপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ২০১৭ সালের মাঝামাঝি প্রকাশ হয় তার দ্বিতীয় উপন্যাস দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস। দেশ পত্রিকায় পৌলোমী সেনগুপ্ত উপন্যাসটি নিয়ে মোক্ষম একটি সমালোচনা করেছিলেন, ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস খুলে একটি খটকা লাগে। প্রথম উপন্যাসের পর তিনি কুড়ি বছরে যা লিখেছেন, তাকে মোটামুটি রাজনৈতিক প্রবন্ধ বলা যেতে পারে। মৌখিকভাবেও জানিয়েছেন তার বিশ্বাসের কথা। সেই কারণেই কি এই বইটিতেও তার বিশ্বাসের বাড়াবাড়ি রকম প্রভাব! কোনও বিশেষ ভাবনা বা বিশ্বাসের পরিপন্থী বা অনুপন্থী হওয়ায় ভুল নেই। কিন্তু উপন্যাস ও সুরম্য প্রবন্ধের পার্থক্য থাকবে, তা আশা করা অন্যায় নয় নিশ্চয়ই।’ চরিত্রগুলোকে পরিপক্ব করে তোলায় অরুন্ধতী ব্যর্থ হয়েছেন বলে পৌলোমীর কাছে মনে হয়েছে।

ভারতীয় ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ ২০০০ সালের ২৬ নভেম্বর ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য হিন্দুতে নর্মদা আন্দোলনে অরুন্ধতী রায়ের অংশগ্রহণ নিয়ে লেখেন ১৯৯৯ সালের মে মাসে সর্দার সরোবর বাঁধ নিয়ে (নর্মদা নদীর ওপর বাঁধ) অরুন্ধতী রায়ের প্রবন্ধ আউটলুক ও ফ্রন্টলাইন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। লেখাটি নিয়ে সে সময় আমার অনুভূতি ছিল মিশ্র। বিশ্লেষণের দিক থেকে লেখাটি মৌলিক ছিল না। সাহিত্যের দিক থেকে ছিল নিজের ইচ্ছার প্রতিফলন এবং বাগাড়ম্বর। গণস্বার্থে এর আগেও রায়ের সাংবাদিকতা নিয়ে আমি বিরক্ত হয়েছিলাম; সেটা ছিল ১৯৯৮ সালে পরমাণু পরীক্ষা নিয়ে তার তর্ক নিয়ে। রায় বলেছিলেন, অনেকে তাকে পরামর্শ দিয়েছিল বোমার ব্যাপারে পারমাণু বোমার বিরুদ্ধে না লিখতে, লিখলে আয়কর বিভাগের লোকজন তার পেছনে লাগতে পারে। রায় এ পরামর্শকে উপেক্ষা করে লিখেছেন।

অরুন্ধতী রায় তার প্রবন্ধটি লেখার মাসখানেক আগে পোখরান বিস্ফোরণের বিরুদ্ধে কলকাতার রাস্তায় চার লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিবাদ মিছিল করেছিল। এ মানুষদের বাড়িঘরে কি আয়কর বিভাগের কর্মকর্তারা হানা দিয়েছিল?

এই লেখিকা কাশ্মীর স্বাধীনতা আন্দোলনের সমর্থক। তিনি ২০১০ সালে কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামীদের সাথে সংহতি জানিয়ে এক সমাবেশে অংশ নিয়ে বলেছিলেন, ‘কাশ্মীরের জনগণ নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে, তারা সাবলম্বী। তাই ভারতের হাত থেকে কাশ্মীরের স্বাধীন হওয়া দরকার।‘ কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে কাশ্মীর নিয়ে গভীরে গিয়ে তিনি কখনই তার বক্তব্য পেশ করেন নি। বরং তার বক্তব্য সবসময় জাতীয়তা বাদের বিপক্ষে। তিনি মুখ খুলেছেন মোদী সরকারে বিরুদ্ধে। তিনি বললেন - “স্বাধীনতার পর থেকে ভারত হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবেই নিজেকে তুলে ধরেছে, কিন্তু সেই ভাবনাকে বৈধতা দিচ্ছে মোদী সরকার”। এখানেই প্রশ্ন ওঠে স্বাধীনতার পর থেকে ভারত কী করে হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী হল? বরং তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ মুসলমান তোষণের। তিনি আরো বলেন, “বস্তারে পুলিশ সেনার ভূমিকা নিয়েছে। আবার জম্মু কাশ্মীরে সেনা পুলিশের ভূমিকা নিচ্ছে। জম্মু-কাশ্মীরে সেনা ট্রাফিক সামলাচ্ছেন, এরকম ঘটনাও দেখে থাকতে পারে মানুষ। অন্যদিকে বস্তারে আদিবাসীদের লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়ছে পুলিশ”।

অর্থাৎ বারেবারে প্রচারের লোভে অরুন্ধতী যে মন্তব্য করছেন তা অবশ্যই প্ররোচনামূলক যা সতত বিতর্কের সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে তিনি ছিলেন একটি অজানা নাম। সেখানে ইংরেজি ভাষায় উপন্যাস পড়ার লোকও মুষ্টিমেয়। কিন্তু তাকে নিয়ে টালবাহানা করে তাকে তারা আনলেন প্রচারের আলোয়। এরপরে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে তিনি মতামত দিয়ে যখন বিতর্ক সৃষ্টি করবেন তখন বাংলাদেশ সরকারের মোটেই ভাল লাগবে না। তাই এই ধরণের প্রচারপ্রিয় সুশীলদের বলতে দেওয়াই শ্রেয় কারণ সে বুদবুদ বেশিক্ষণ স্থায়ী নয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর
 

Best Electronics