Alexa অভুক্ত এতিমদের কাঁদিয়ে রান্নাঘর খোলা রেখেই চলে গেলেন দাদু

অভুক্ত এতিমদের কাঁদিয়ে রান্নাঘর খোলা রেখেই চলে গেলেন দাদু

সাহিদা আফরিন মিথিলা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:০২ ১ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৭:০৯ ২ নভেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

তাকে সবাই দাদু বলেই ডাকে। এর পিছনের কারণ হয়তো তার ইউটিউব চ্যানেলের নাম। তার নাম নারায়ণ রেড্ডি। দৈনন্দিন জীবনে কমবেশি আমরা সবাই রান্না করি। তবে আমাদের রান্নার কারণ হয় নিজেদের ক্ষুধা নিবারণ করা অথবা নিজেদের প্রয়োজন মেটানো। 

নারায়ণ রেড্ডিও রান্না করতেন। ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ডোনাট, বার্গার, বাটার চিকেন থেকে শুরু করে বিরিয়ানি সহ আরো বিভিন্ন মজার খাবার রান্না করতে পারতেন তিনি। তার রান্নার পরিমাণটাও ছিল অনেক বেশি। তবে এই ব্যক্তির রান্না করার কারণটা ছিল ভিন্ন। তিনি রান্না করতেন অনাথ শিশু ও অভুক্ত পথশিশুদের জন্য। সপ্তাহে দু’দিন তিনি এসব বাচ্চাদের রান্না করে খাওয়াতেন। তার এসব কাজের পিছনে কারণ ছিল একটাই, সেটি হল মানবসেবা।

রান্না করছেন দাদু২০১৭ সালে তিনি প্রথম নিজের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পান। তেলঙ্গানার কয়েকজন যুবক তার সঙ্গে যুক্ত হন। ইট দিয়ে উনুন বানিয়ে তিনি অনাথাশ্রমের শিশুদের জন্য খাবার তৈরি করতে শুরু করেন। জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে আনা, আর তারপর সেই কাঠের টুকরো দিয়ে উনুন ধরানো।

এভাবেই শুরু হত গ্র্যান্ডপার রান্না। তার কাজ শুধু বাচ্চাদের রান্না করে খাওয়ানো ছিলনা। বাচ্চাদের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় চাহিদাও পূরণ করতেন তিনি। দুস্থ শিশুদের সব ধরনের সেবা দেয়ার চেষ্টা করতেন তিনি। এমনকি তিনি এমন সব খাবার রান্না করতেন যা বাচ্চারা খেতে ভালোবাসে। 

বার্গারযুগে যুগে অনেক মানুষ আমাদের মানবতার শিক্ষা দিয়ে যায়। রেখে যায় তাদের মানবদরদী কাজের হরেক রকম উদাহরণ। তেমনি একজন ব্যক্তি ছিলেন নারায়ণ রেড্ডি। তিনি ভারতের তেলাঙ্গানার একজন বাসিন্দা ছিলেন। ‘গ্র্যান্ডপা কিচেন’ নামক ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে তিনি তারকা বনে যান। তার রান্না ও মানব প্রেমের খ্যাতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে আছে। 

মহান এই ব্যক্তি গত ২৭ অক্টোবর পরলোকগমন করেছেন। তার মৃত্যুতে শোকাহত তার চ্যানেলের সব দর্শক এবং তার ভক্তরা। সামাজিক মাধ্যমে তাকে নিয়ে লেখা হয়েছে বিভিন্ন শোকের বাণী। তবে সবার লেখার মধ্যে একটি কথা এক ‘আপনাকে মিস করবো দাদু’। মৃত্যুর পরেও হাজার হাজার মানুষের ভালোবাসায় শিক্ত হয়েছেন তিনি।

নুডলস রান্না করছেন গ্র্যান্ডপা কিচেনের সদস্যরা
তবে মারা যাওয়ার কয়েক দিন আগে শেষবারের মতো গ্র্যান্ডপা একটা ভিডিও করেছিলেন। তাতে তিনি শারীরিক পরিস্থিতির কথা সমস্ত ফলোয়ারদের জানিয়েছিলেন। তার মৃত্যুর খবর পাওয়া মাত্র ‘গ্র্যান্ডপাজ কিচেন’-এ শোকবার্তার ঢল নেমেছে। ভক্তরা ইউটিউবেই বিদায় জানালেন তাদের প্রিয় গ্র্যান্ডপাকে।

নারায়ণ রেড্ডির ছেলে শ্রীকান্ত রেড্ডি একটি ইউটিউব চ্যানেল চালায় যার নাম গ্র্যান্ডপা কিচেন। চ্যানেলটিতে তিনি মূলত তার বাবার রান্নার ভিডিওগুলো আপলোড করতেন। এছাড়া তার বাবার সামাজিক কাজকর্মের ভিডিওগুলোও সেখানে আপলোড করা হত। বিশ্বজুড়ে এই ব্যক্তিকে এই চ্যানেলের মাধ্যমেই চিনেছে সবাই। তার সব ভিডিওগুলোরই ব্যাপ্তি ১০ থেকে ১৫ মিনিটের। 

কিটকেটের বাহারযেখানে দেখানো হয়, বিশাল অংশের খাবার তৈরীর পদ্ধতি। ভিডিওগুলো দেখে অনেকে সুযোগ পান দাদুর রান্না দেখে শেখার। ২০১৭ থেকে ২০১৯ এই দু’বছরে তিনি ২২০ রকম পদ রান্না করেছেন তিনি। এই মাত্র দু’বছরেই তার ইউটিউব ফলোয়ার ৬০ লাখ ১১ হাজার। আর ফেসবুক ফলোয়ার ৫ লাখ ৩০ হাজার! এখনও পর্যন্ত তার সবচেয়ে জনপ্রিয় রেসিপি হলো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই। এই রেসিপির ভিউ হয়েছিল ৩৭ কোটি। 

আর দ্বিতীয় জনপ্রিয় রেসিপি হলো ১০০ ম্যাগি প্যাকেট দিয়ে নুডলস রেসিপি। প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার তিনি রান্না করতেন। বড় কড়াই, হাতা নিয়ে সেই রান্নার পুরো প্রণালীটাই ভিডিও করা হত। তারপর সেটা ইউটিউবে আপলোড করা হত। প্রতিটা ভিউয়ারেরই অত্যন্ত প্রিয় মানুষ ছিলেন নারায়ণ। তার প্রতি ভিডিওর নীচে কমেন্ট করতেন ভিউয়াররা। অনেকে তাকে সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে দিতেন। 

রান্নায় ছিলো দাদুর সুনিপুণ দক্ষতামানুষ যখন কোনো ভালো কাজ করে তখন স্বাভাবিক নিয়মে সবার মনে প্রশ্ন তৈরী হয়। সেটি হল কেন? এখানে কেন বলতে বুঝিয়েছি তার কাজের কারণগুলোকে। সবাই জানতে চায় তার কাজের প্রেরণা কী? এসব করে তার কি লাভ হচ্ছে?

আসলে বর্তমান সমাজে এমন একটি অবস্থা তৈরী হয়েছে যেখানে আসলে কারণ ছাড়া কেউ কারো কোনো উপকার করতে চায়না। সেখানে একজন মানুষ নিঃস্বার্থভাবে শিশুদের জন্য এত কিছু করছে এটাই সবার মধ্যে ‘কেন’ শব্দটির জন্ম দিয়েছে। এই কেন শব্দটির অর্থ খোঁজার জন্য অনেকেই ব্যবহার করেছে ইন্টারনেট সার্চ ইঞ্জিন গুগল। 

চিকেননারায়ণ রেড্ডি সম্পর্কে কোনো বিতর্ক আছে কিনা সেটি জানার জন্য গুগলে অনেকে খোঁজ করেছেন। কিন্তু তার সম্পর্কে গুগলেও কোনো বিতর্ক বা খারাপ কোনো মন্তব্য নেই। আপনি জানলে অবাক হবেন, গুগলে যখন তার সম্পর্কে বিতর্ক খোঁজা হয় তখন গুগল অন্য একটি তথ্য প্রদান করে। সেটি হলো তার মানবতার কাজ সম্পর্কে তথ্য।
 
গ্র্যান্ডপা কিচেন এর প্রতিটি ভিডিওর শুরুতে একটি উক্তি থাকে। এমনকি উক্তিটিকে তাদের চ্যানেলের নীতি বলা হয়। উক্তিটি হলো, ‘ভালোবাসা, পরিচর্যা, ভাগ করে নেয়া। এটাই আমার পরিবার।’ এমন একটি উক্তি শুনে আপনি অবশ্যই অনুপ্রাণীত হবেন। মহান এই ব্যক্তিকে তার ভক্তরা ‘মানবতার উদাহরণ’ বলেন। 

এতিম শিশুদের খাওয়ানো হতো সেসব খাবার৭৩ বছর বয়সী এই মহান মানুষ কাঁদিয়ে রেখে গেছেন তার লাখো ভক্তকে। কারো ভালো কাজের জন্য যদি চোখে অশ্রু আসে তাহলে সেই অশ্রু হয়ত ওই ব্যক্তির জন্য অমূল্য প্রাপ্তি হবে। তাই সবার সাথে মিলিয়ে এই কথাটাই বলতে চাই 'আপনাকে মিস করবো দাদু।

তবে ‘গ্র্যান্ডপাজ কিচেন’ বন্ধ হবে না। অনাথ শিশুদের খাওয়ানোর যে স্বপ্ন নারায়ণ দেখেছিলেন, তা পূর্ণ করার কথা জানিয়েছেন তার সহকর্মীরা। গ্র্যান্ডপার শেষ যাত্রার ভিডিওতে এমনটিই জানিয়েছেন তারা। গ্র্যান্ডপার কিচেনে কোনো আভিজাত্য ছিল না। একেবারেই ঝাঁ চকচকে নয়। বরং ঘাসের উপরে, খোলা আকাশের নীচে সাদা জামা আর লুঙ্গি পরে রান্না করতেন তিনি। কিন্তু তার আন্তরিকতা অনাথ শিশুদের কাছে সেই রান্নার স্বাদ বড় রেস্তোরাঁকেও হার মানাত।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস