Alexa অভিষেক হোক সত্য আর ন্যায়ের 

অভিষেক হোক সত্য আর ন্যায়ের 

প্রকাশিত: ১৬:২৮ ২১ মার্চ ২০১৯  

অাফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফোব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিতে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

‘ঢাকা বিশ্ববিদালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের’ (ডাকসু)  নির্বাচন হল গত ১১ মার্চ। ২৮ বছর পর এ নির্বাচন হলো। 

নির্বাচন নিয়ে অনেক উত্তেজনা ছিলো। এখনো আছে। ক্লাস বর্জন, বয়কট, ধর্মঘট চলছে। নির্বাচনে ভিপি পদে কোটা আন্দোলনের নেতা ও ‘সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদে’র প্রার্থী নুরুল হক প্রায় ২০০০ ভোটে ছাত্রলীগের প্রার্থী রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে পরাজিত করেন। সমাজসেবা সম্পাদক পদে কোটা আন্দোলনকারী আখতার হোসেন জয়ী হন। বোঝা গেছে, কোটা আন্দোলনকারীদের প্রতি সাধারণ ছাত্রদের আস্থা আছে।  অন্যান্য পদে ছাত্রলীগ জয়ী হয়েছে।  তবে হলগুলোতে বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। কুয়েত মৈত্রী হলের ১৩টি পদের সবগুলোতেই স্বতন্ত্রী প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এদেশের সমস্ত প্রতিরোধ আন্দোলন সংগ্রামের সূতিকারগার।  ৫২- এর মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু, ৬২, ৬৬, ৬৯-এর আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান ও ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে রয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অসামান্য অবদান। পরবর্তীতে স্বৈরাচার আর সামরিকতন্ত্র পতনের সংগ্রামেও তারা ছিল বড় শক্তি। তাদের হাত ধরেই শুরু হয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা।  এটাই হবার কথা। ছাত্রশক্তিই বড় শক্তি, তারুণ্যের কোনো বিকল্প নেই। বিকল্প নেই তেজ সাহস সততা আত্মদানের মানসিকতার। যেটার প্রমাণ দিয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বার বার। তাই ঢাকার রাজপথে যেমন তাদের রক্ত আছে, এ দেশের ইতিহাসে আছে তাদের গৌরবগাথা। যা হাজার চেষ্টা করেও মুছবার নয়। এখনো জাতির যেকোন দুর্যোগ মুহূর্তে আমরা  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েদের রাজপথে দেখি। কখনো তারা গণজাগরণ মঞ্চের আদলে, কখনো কোটা আন্দোলনের আদলে তারা পথে নাম। দাবি আদায়ে তৎপর হয়।

দেশে এখন প্রায় ১০০ টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। কিন্তু তাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য ছাত্র–ছাত্রীদের যে আকাঙক্ষা, যে আকুলতা তা এতটুকু কমেনি। এখনো সারা দেশের ছাত্র ছাত্রীর প্রথম পছন্দ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।  যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায় না, তারাই যায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে। ব্যতিক্রম আছে, তবে সে সংখ্যা নিতান্তই নগণ্য।

সেই ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এতগুলো বছর নের্তৃত্বশূন্য ছিল। নির্বাচন হল। তবে ফলাফল ঘোষণার আগেই ব্যাপক অনিয়ম কারচুপি হামলা ধরপাকড়ের অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জন করেছিল ছাত্রলীগসহ বাকি সব প্যানেল। ফলাফল ঘোষণায়  দেখা যায়, নুরুল হক ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন।  বামজোট সমর্থিত বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা নির্বাচন বাতিল ও পুনঃ তফসিলের দাবি জানিয়ে ধর্মঘট চালিয়ে যাচ্ছেন। আওয়ামীলীগ, বিএনপি নির্বাচন নিয়ে বরাবরের মতো  বক্তব্য পাল্টা বক্তব্য দিয়ে চলেছে।

এবার বিপুল সংখ্যক ছাত্রী নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিল। যদিও ডাকসুর বড় বড় পোস্টগুলোতে তারা প্রার্থী হতে পারেনি। কারণটা অজানা। নারী বলে কী?  তবে এদের মধ্যে অরণী খান সেমন্তী নামের ছোটখাট কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত মেয়েটি সবার নজর কেড়েছিল। সে কোটা আন্দোলনে মার খেয়েও থেমে যায়নি। রাজপথে ছিল। নির্বাচনেও এসেছিল। রোকেয়া হলের মধ্যে তাকে হামলা করা হয় রীতিমতো নির্দেশ দিয়ে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য এটা বড় লজ্জার!

ফলাফল ঘোষণার পর ছাত্রলীগ ভিপি পদে নুরুল হকের বিজয় মেনে নেয়নি। তারা অধাঘন্টা ভিসিকে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে শোভন নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে নুরুল হককে অভিনন্দন জানায় । নুরুল হকও বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ছাত্রলীগের সহযোগিতা কামনা করে। কিন্তু বরাবর যেমন হয়,  নুরুল হককে নিয়ে তেমনই কাদা ছুঁড়াছুড়ি শুরু হয়েছে। একটা পক্ষ তাকে রাজাকার, শিবির সুবিধাবাদি বানাবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। গণজাগরণ মঞ্চের নেতার ক্ষেত্রেও এটা আমরা দেখেছিলাম। তার বাবা যে কত বড় রাজাকার সেটা রাতারাতি দেশবাসী জেনেছিল। কারো বাপ চাচা চৌদ্দপুরুষ যদি রাজাকার হয় সে দায় কী তার! সে নিজে কি সেটাই বিবেচ্য।  অন্যদিকে রোকেয়া হলের প্রোভেস্ট জিনাত হুদাকে লাঞ্ছনা ও তার অফিস ভাঙচুরের অভিযোগে নুরুল হক ও ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটনসহ ৭জনের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা হয়েছে। নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে  জিনাত হুদার বিরুদ্ধে ছাত্রীদের বিক্ষোভ চলছে। ৫জন ছাত্রী আমরণ অনশনে নেমেছিল। রোকেয়া হলে ৯ বাক্স ব্যালট থাকার কথা থাকলেও ৬ বাক্স ব্যালট পাওয়া যায় ।

এক ঘন্টা  দেরিতে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। পরে ভোট গ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়। তিন বাক্স ব্যালট পাশ্ববর্তী একটা ঘরে পাওয়া যায়। তবে তাতে ভোট  দেয়া ছিল না। এ ঘটনার প্রতিবাদ করতে এলে ভিপি নুরুল হক নুরু রোকেয়া হলের এক শ্রেণির ছাত্রীদের  আগ্রাসনের শিকার হন। সেমন্তীকে মারপিট করা হয়। এ ঘটনার জেরে প্রোভেস্টের পদত্যাগ দাবিতে আন্দেলনে নেমেছে ছাত্রীরা। জয়ী ভিসি নুরুল হক ছাত্রীদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছে । আগামী ৩১ তারিখের মধ্যে পুনঃনির্বাচনের দাবি করেছে নুরুল হক। তবে নুরুল হক তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের জন্য এরইমধ্যে সমালোচিত হয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডাকসুর নব নির্বাচিত সংসদকে চা পানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেখানে নুরুল হকসহ সংসদের অন্য সংদস্যরা গিয়েছিলেন। কিন্তু সুফিয়া কামাল হল সংসদের সদস্য লামিয়া তানজিন তানহা  যাননি । মাননীয় প্রধানমন্ত্রী  নবনির্বাচিত সংসদকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, ‘ডাকসু সংসদ কোনো দলের নয়। তারা সব ছাত্রদের জন্য কাজ করবে।’  

২৮ বছর পরে ডাকসুতে নির্বাচন হল, এই বিষয়টাকেই আমি অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। ১৯২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে  ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ’ নামে ডাকসুর প্রতিষ্ঠা। ১৯৫৩ সালে গঠনতন্ত্র সংশোধন করে বর্তমান নাম রাখা হয়। সেই থেকে যারা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি বা জিএস হয়েছেন পরবর্তীতে তাদের অনেকেই মন্ত্রী হয়েছেন বা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছেন। দেশের রাজনীতিতে রেখেছেন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসুকে বলা হয় দেশের ‘দ্বিতীয় সংসদ।’  

নির্বাচন নিয়ে অনেক অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও সম্প্রতি ভিসি স্যার দশ টাকায় ১ কাপ চা, ১টা সিঙ্গাড়া, ১টা সমুচা ১টা চপ খাইয়ে বড়ই বিপদে পড়েছেন। শিক্ষা নয়, গবেষণা নয়, শিক্ষার্থীদের কোন কীর্তি নয়, এই দশ টাকার চা সিঙ্গাড়াকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য আর গর্ব বলে তিনি বিপদ আরো গাঢ় করেছেন। তিনি হয়ত মজা করেই বলেছেন।  তিনি  দেশ গঠনে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানের কথাও বলেছেন।  কিন্তু ঐতিহ্য বলে তিনি বড়ই বিপাকে পড়েছেন। সেজন্য তাকে কম খেসারতও দিতে হয়নি। তার বক্তব্যের সামনে পেছনে কাট করে ছোট্ট একটা ভিডিও বানিয়ে কেউ সোস্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেয়। সেটা অচিরেই ভাইরাল হয়। তারপর ওঠে মন্তব্যের ঝড়। কেউ কেউ তাকেই  ‘গ্রিনিজ বুক অব  রেকর্ডসে’ স্থান দিতে বলেন। কেউ বলেন, তাকে মমি বানিয়ে রাখতে। কেউ কেউ এমনটাও বলেন যে, সার্কাস চলছে । অনেকে তাকে চায়ের দোকান দিতে বলেন। কেউ বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোন হোটেল নয় যে, সস্তা খাবারের প্রলোভনে আকর্ষিত হয়ে এখানে ছাত্ররা আসবে।  এমনকী শিক্ষকরাও বিষয়টা নিয়ে কথা বলেছেন। অনেকেই বলেছেন,  ‘ওই চেয়ারে থেকে এমন কথা বলা তার ঠিক হয়নি, হাস্যরস করে বললেও।’  

তবে নির্বাচনট করে তিনি একটা  ভালো কাজ করেছেন। আগামী কাল (২৩ মার্চ) ডাকসু সংসদের অভিষেক। আমি অভিনন্দন জানাই ভিসি স্যার আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে। অভিনন্দন জানাই, নব নির্বাচিত ডাকসু সদস্যদের। তারা  একটি ছাত্রবান্ধব, স্বাস্থ্যসম্মত মানবিক, নিরাপদ,  সচেতন, দেশপ্রেমে উদ্দীপ্ত ক্যাম্পাস উপহার দেবেন, ক্যাম্পাস থেকে হানাহানি, অপরাজনীতি, ছাত্রী হেনস্থা বিদায় হবে  এটাই আমার প্রত্যাশা।   

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর