Alexa অভিমানী বিদ্যাসাগরের জীবনের অন্তিম পর্ব

অভিমানী বিদ্যাসাগরের জীবনের অন্তিম পর্ব

প্রকাশিত: ১৪:২৭ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

(আজ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দ্বিশত জন্মবার্ষিকী। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উনবিংশ শতকের একজন বিশিষ্ট বাঙালি শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও গদ্যকার। এক কথায় বলা যায় বাঙালি নবজাগরণের যুগপুরুষ। তার উজ্জ্বল জীবনের অন্তিম পর্ব বড় অভিমানের। বিক্ষত বিদ্যাসাগর একাকী যেন সন্ন্যাস জীবন যাপন করেছেন। আজ তার সেই অভিমানের গল্প)

ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের জামতাড়া ও মধুপুরের মাঝে ছোট্ট স্টেশন কর্মাটাড়। সেখানে মূলত সাঁওতালদের বাস। জ্যেষ্ঠ সন্তান, একমাত্র ছেলে নারায়ণচন্দ্রের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে বিদ্যাসাগর ১৮৭২ সালে তাকে ত্যাজ্য ঘোষণা করেন। কিছু দিন পরই মারা যান স্ত্রী দীনময়ী দেবী। কার্মাটাড় জায়গাটি ছিল সাঁওতাল প্রধান। তাদের সারল্যে মুগ্ধ হয়ে বিদ্যাসাগর বাকি জীবনটা সেখানেই কাটাবেন স্থির করেছিলেন। তা অবশ্য হয়নি। শরীর-স্বাস্থ্যের ভগ্নদশার কারণে ১৮৯১ সালের জুন মাসে বাদুড়বাগানের বাড়িতে ফিরলেন পাকাপাকিভাবে। ২৯শে জুলাই, ১৮৯১। রাত দুইটা বেজে আঠেরো মিনিট। চোখ খুলে চাইলেন, তার পর চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল সেই উজ্জ্বল দু’টি চোখ।

বিদ্যাসাগরের জীবনে আঘাত ছিল তার নিয়মিত প্রাপ্তিযোগ। ঈশ্বরচন্দ্র ১৮৫৫-তে বিধবাবিবাহ সংক্রান্ত বই প্রকাশের কিছুদিন আগে কলকাতার পটলডাঙার শ্যামাচরণ দাস নিজের বিধবা মেয়ের বিয়ে দেয়ার মানসে স্বপক্ষ পণ্ডিতদের মতামত সংগ্রহের এক চেষ্টা করেন। তখন কাশীনাথ তর্কালঙ্কার, ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন, রামতনু তর্কসিদ্ধান্ত, ঠাকুরদাস চূড়ামণি, হরিনারায়ণ তর্কসিদ্ধান্ত, মুক্তারাম বিদ্যাবাগীশ প্রভৃতি ব্রাহ্মণ পণ্ডিত স্বাক্ষর সম্মতি দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পরে তারাই আবার বিধবাবিবাহের বিষয় বিদ্বেষী হইয়া উঠেন। এরা ছিলেন বিদ্যাসাগরের ঘনিষ্ঠ। কিন্তু আশ্চর্যের কথা এই যে বিদ্যাসাগরের বন্ধুদের বিধবা বিবাহের ব্যাপারে প্রত্যাশিত ভূমিকা পালনে দুর্বলতা ও ব্যর্থতা বিদ্যাসাগরকে বিস্মিত করেছিল। বিদ্যাসাগরের বিশিষ্ট বন্ধু রামমোহন রায়ের পুত্র রমাপ্রসাদ রায় বিধবাবিবাহ প্রচেষ্টাকে সবসময় সমর্থন করে এসেছিলেন। তবে বিধবাবিবাহ আইন প্রণয়নের পর প্রথম বিবাহ অনুষ্ঠানটিতে তিনি নানা অজুহাত দেখিয়ে অনুপস্থিত থাকলেন। বিদ্যাসাগর এতটাই ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন যে রমাপ্রসাদ রায়ের সঙ্গে দেখা করে খুব খোলাখুলি তার বিরক্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। চলে আসার সময় দেওয়ালে টানানো রামমোহন রায়ের ছবিটার দিকে নির্দেশ করে বলেছিলেন : ‘ওটা ফেলে দাও, ফেলে দাও।’

বিদ্যাসাগর যখন বাল্যবিয়ে নিষিদ্ধ করে আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে আন্দোলন করছিলেন তখন কেশব সেন ছিলেন তার উৎসাহী সমর্থক। ১৮৭২ সনে প্রণীত ‘সহবাস সম্মতি আইনে’র এই বিপ্লবী সমর্থক কিছুদিন পরেই তার নাবালিকা কন্যার পাণিপ্রার্থনা করে কুচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ বিবাহের প্রস্তাব পাঠালে পরে সমস্ত নীতি বিসর্জন দিয়ে ওই প্রস্তাবে সম্মতিই জানালেন না, পাত্রপক্ষের অভিপ্রায় অনুযায়ী হিন্দুরীতি ও সংস্কার অনুসরণ করে বিয়ের অনুষ্ঠানও করলেন। এই দৃষ্টান্ত বিদ্যাসাগরকে গভীরভাবে আহত করেছিল। উদাহরণের এখানেই শেষ নয়। মেদিনীপুরে কেদারনাথ দাস যিনি একদিন উৎসাহী হয়ে বিধবাবিবাহ দিয়েছিলেন, তিনিই দুই বৎসর পরে তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে প্রায়শ্চিত্ত করেছিলেন।

১৮৪৭ সালে বারাসাতে যখন প্যারীচরণ সরকার, কালীকৃষ্ণ মিত্র, নবীনকৃষ্ণ মিত্র প্রমুখ একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন তখন ঐ ব্যক্তিদের সমাজচ্যুত করা হয়েছিল। স্ত্রী-শিক্ষার প্রসার অবশ্য রোধ করা গেল না, বিশেষ করে ১৮৫০ সাল থেকে বেথুন বালিকা বিদ্যালয়ের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের সংযোগ সুবাদে নারী-শিক্ষা প্রসারে তার উদ্যোগ একটি ব্যাপক কার্যক্রমেরই সূচনা করল। নভেম্বর ১৮৫৭ থেকে মে ১৮৫৮ এই সাত মাসের মধ্যে বিদ্যাসাগর ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করলেন। সেজন্যেই বিদ্যাসাগরের আশাভঙ্গের তীব্রতাও এইখানে যে, তাঁর সহযাত্রী বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর ব্যবহারের মধ্যে যে পারম্পর্য, সাহস ও নিষ্ঠা তিনি প্রত্যাশা করেছিলেন তা তিনি দেখতে পাননি, বিশেষ করে সামাজিক সন্ত্রাস, নিষ্ঠুরতা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ গড়ে তোলা উচিত ছিল সে সম্পর্কে বুদ্ধিজীবী শ্রেণি রইলেন উদাসীন অথবা অক্ষম।

বিদ্যাসাগর একটির পর একটি সংস্কার কার্যক্রমে হাত দিয়েছেন আর একটির পর একটি বন্ধু বিচ্ছেদ ঘটেছে। ১৮৬৬-তে বিদ্যাসাগর যখন বহুবিবাহবিরোধী আন্দোলন শুরু করলেন তখন তারানাথ তর্কবাচস্পতি ও সোমপ্রকাশের দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ যারা ছিলেন বিদ্যাসাগরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু তারা ওই বিষয়ে সরকারের কাছ আবেদনের উদ্যোগ নিলে বহুবিবাহ যে শাস্ত্রবিরুদ্ধ নয় এটাই প্রমাণের চেষ্টা করলেন। এর নিরাকরণার্থে আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা তারা স্বীকার করলেন না। এদিকে নব্য পাশ্চাত্য শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের কাছ থেকে তিনি যে বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিলেন তার তীব্রতায় এবং কখনো কখনো রুচিহীনতায় বিদ্যাসাগর নিশ্চয়ই বিস্মিত ও গভীরভাবে আহত হয়েছিলেন। রাজেন্দ্রলাল মিত্র, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, নবগোপাল মিত্র, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়– এদের আক্রমণের ক্রমান্নয়ী উত্তুঙ্গতা তাকে ক্লান্ত করে ফেলেছিল। বিদ্যাসাগরের অন্য বিশিষ্ট বন্ধু কৃষ্ণদাস পাল বহুবিবাহ নিবর্ত্তন আইনের সহায়তা বিষয়ে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে সহমত পোষণ করতেন এবং বিদ্যাসাগর যে আবেদন সরকারের কাছে পেশ করেছিলেন তাতে সইও করেছিলেন, যেমন সই করেছিলেন রাজেন্দ্রলাল মিত্রও, কিন্তু পরে এরা দুজনেই আইন প্রণয়নের বিরোধিতা করেন। তবে তীব্রতম ব্যক্তিগত আঘাত সম্ভবতঃ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকে। ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসে সূর্যমুখীর মুখ দিয়ে বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বলিয়ে ছিলেন : ‘যে বিধবার বিবাহের ব্যবস্থা দেয়, সে যদি পণ্ডিত তবে মূর্খ কে?’

বিদ্যাসাগরের জীবৎকালে ন্যূনাধিক ষাটটির মতো বিধবা বিয়ে তিনি দিতে পেরেছিলেন। এ সমস্ত বিয়েতে অধিকাংশ সময় সমস্ত খরচ তিনিই বহন করেছিলেন, কিন্তু এর ফলে ক্রমেই তিনি ঋণভারে জর্জরিত হয়ে পড়েছিলেন। তার মূল কারণ বন্ধুবর্গের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও পশ্চাদপসরণ। বিদ্যাসাগর ক্রমেই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছিলেন।

পারিবারিক ক্ষেত্রেও বিদ্যাসাগর প্রতিমুহুর্তে বিক্ষত হয়েছেন। দিনময়ী দেবী তার ছেলে নারায়ণচন্দ্রের বিধবাবিবাহে [আগস্ট, ১৮৭০] মর্মাহত হয়েছিলেন এবং এ জন্য স্বামীকে সম্ভবতঃ কখনোই ক্ষমা করতে পারেন নি। যদিও এ বিয়ে নারায়ণচন্দ্রের স্বীয় পছন্দ ও উৎসাহানুকূল্যেই হয়েছিল, বিদ্যাসাগরের প্ররোচনায় নয়। বিদ্যাসাগর অবশ্য অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন এবং নিজে উপস্থিত থেকে সেই বিয়ে দিয়েছিলেন। এই বিয়েতে তার ভাই শম্ভুচন্দ্রেরও মত ছিল না। বিদ্যাসাগর তার ভাইকে লিখেছিলেন: ‘আমি বিধবাবিবাহের প্রবর্তক, আমরা উদ্যোগ করিয়া অনেকের বিবাহ দিয়াছি এমন স্থলে আমার পুত্র বিধবা বিবাহ না করিয়া কুমারী বিবাহ করিলে আমি লোকের নিকট মুখ দেখাইতে পারিতাম না। নারায়ণ স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া এই বিবাহ করিয়া আমার মুখ উজ্জ্বল করিয়াছে।’ সেই ছেলে নারায়ণচন্দ্র ১২৭১ সালে পৃথগন্ন হয়ে গিয়েছিলেন।পুত্রের সঙ্গে সম্পর্ক এতটাই তিক্ত হয়েছিল যে তিনি তার সম্পত্তির বিলিবণ্টন সংক্রান্ত শেষ উইলে প্রায় তিপ্পান্নজন আত্মীয়-স্বজন, আশ্রিত, বন্ধুবর্গ প্রমুখের জন্য বৃত্তি, মাসোহারা ও আর্থিক সাহায্য প্রভৃতির ব্যবস্থা করেছেন কিন্তু পুত্র নারায়ণচন্দ্রকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে স্পষ্টভাষায় লেখেন: ‘আমার পুত্র বলিয়া পরিচিত শ্রীযুত নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় যারপরনাই যথেচ্ছাচারী ও কুপথগামী এ জন্য ও অন্য অন্য গুরুতর কারণ বশতঃ আমি তাহার সংশ্রব ও সম্পর্ক পরিত্যাগ করিয়াছি এই হেতু বশতঃ বৃত্তি নির্ব্বন্ধস্থলে তাহার নাম পরিত্যক্ত হইয়াছে এবং এই হেতু বশতঃ ... ... আমার উত্তরাধিকারী বলিয়া পরিগণিত অথবা ... এই বিনিয়োগপত্রের কার্যদর্শী নিযুক্ত হইতে পারিবেন না।’ 

বিদ্যাসাগর উইলে ছেলেকে ত্যাগ করেছিলেন, কিন্তু পুত্রবধূ ভবসুন্দরীর জন্য মাসিক ১৪ টাকা বৃত্তির ব্যবস্থা করেছিলেন। ১২৭৬ সালের ২৫ অগ্রহায়ন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তার পিতামাতা, স্ত্রী ও অন্যান্য ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-পরিজনদের এক গুচ্ছ চিঠি লিখেছিলেন। এক গভীর বেদনা ও তিক্ততায় নিষিক্ত এই সব চিঠি। তিনি তার পরিবার ও আত্মীয়বর্গের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ ঘোষণা করেছিলেন এই সব চিঠির মাধ্যমে। কিন্তু শুধু পরিবারের সঙ্গেই বিচ্ছেদ নয়, তার চতুর্পার্শ্বস্থ সমাজের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন করে এক স্বেচ্ছা নির্বাসনে যাওয়ার সঙ্কল্পও প্রকাশিত হয়েছে এই চিঠিগুলোতে। চিঠিগুলোর একটিতে ঈশ্বরচন্দ্র তার মাকে লেখেন : ‘নানা কারণে আমার মনে সম্পূর্ণ বৈরাগ্য জন্মিয়াছে, আর আমার ক্ষণকালের জন্যও সাংসারিক কোনো বিষয়ে লিপ্ত থাকিতে বা কাহারও সহিত কোনো সংশ্রব রাখিতে ইচ্ছা নাই। বিশেষতঃ ইদানীং আমার মনের ও শরীরের যেরূপ অবস্থা ঘটিয়াছে তাহাতে পূর্বের মত নানা বিষয়ে সংসৃষ্ট থাকিলে অধিক দিন বাঁচিব এরূপ বোধ হয় না। এখন স্থির করিয়াছি যতদূর পারি নিশ্চিন্ত হইয়া জীবনের অবশিষ্ট ভাগ নিভৃতভাবে অতিবাহিত করিব। এক্ষণে আপনার শ্রীচরণে এ জন্মের মত বিদায় লইতেছি।’ চিঠি শেষ করেছেন এই বলে যে, ‘আমি অনেকবার আপনকার শ্রীচরণে নিবেদন করিয়াছি এবং পুনরায় শ্রীচরণে নিবেদন করিতেছি, যদি আমার নিকট থাকা অভিমত হয়, তাহা হইলে আমি আপনাকে কৃতার্থ বোধ করিব এবং আপনার চরণসেবা করিয়া চরিতার্থ হইব।’ ঐ একই দিনে তাঁর পিতাকেও একটি পৃথক চিঠিতে প্রায় একই ভাষায় একই অনুভূতি প্রকার করেছেন। তবে ওই চিঠিতে তার নির্বেদ ও নৈরাশ্যের এক কারণও নির্দেশ করেছেন : ‘সংসার বিষয়ে আমার মত হতভাগ্য আর দেখিতে পাওয়া যায় না। সকলকে সন্তুষ্ট করিবার নিমিত্ত প্রাণপণে যত্ন করিয়াছি। কিন্তু অবশেষে বুঝিতে পারিয়াছি, সে বিষয়ে কোন অংশে কৃতকার্য্য হইতে পারি নাই। যে সকলকে সন্তুষ্ট করিতে চেষ্টা পায়, সে কাহাকেও সন্তুষ্ট করিতে পারে না।’ এই চিঠিতে অবশ্য ‘সকলকে’ বলতে বিদ্যাসাগর পরিবারের সকলকে বুঝিয়েছেন। দুই বছর আগে বীরসিংহ গ্রামে পিতামাতার জীবৎকালেই তাদের একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে গেছে। ভাইয়েরা প্রত্যেকেই পৃথগন্ন হয়েছেন এবং সম্পত্তির আলাদা অংশ দাবি করেছেন, যদিও সম্পত্তি বলতে সবটাই বিদ্যাসাগরের একার অর্জিত সম্পত্তি। বিদ্যাসাগরের বিরক্তি ও তিক্ততার সবচেয়ে বড় কারণ হয়েছে তারই তৃতীয় ভ্রাতা ঈশানচন্দ্রের বিদ্যাহীন, গুণহীন, আদর্শহীন উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাত্রা সত্ত্বেও তার প্রতি পিতামাতার স্নেহান্ধ প্রশ্রয়।

ঈশানচন্দ্র উপর্যুপরি ঋণ করেই চলেছেন আর তা শোধ করতে হচ্ছে বিদ্যাসাগরকে। পিতা লিখে পাঠিয়েছেন: ‘তাহার অনেক ঋণ আছে, তাহা পরিশোধ করিয়া পাঠাইবে।’ বিদ্যাসাগর তার ভাই শম্ভুচন্দ্রকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলছেনঃ ‘ইতিপূর্বে একবার তাহার যথেষ্ট ঋণ পরিশোধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। তৎকালে কোনো কর্মের ভার দিব বলিয়াছিলাম : সে কোন কর্মে লিপ্ত থাকিতে ইচ্ছা করে নাই।’ বিদ্যাসাগর তিক্ততা ও বিরক্তি বোঝা যায়। বিশেষ করিয়া যখন বিদ্যাসাগরের আয় কমে আসছে এবং বিধবাবিবাহের ব্যয়ভার সঙ্কুলান ও অন্যান্য দানধ্যানের কারণে বিদ্যাসাগর ক্রমেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। বিষাদের এটাও একটা কারণ। পিতার একই চিঠিতে তিনি লিখছেন: ‘কার্যগতিকে ঋণে বিলক্ষণ আবদ্ধ হইয়াছি। ঋণ পরিশোধ না হইলে, লোকালয় পরিত্যাগ করিতে পারিতেছি না। এক্ষণে যাহাতে সত্ত্বর ঋণমুক্ত হই, তদ্বিষয়ে যথোচিত যত্ন ও পরিশ্রম করিতেছি। ঋণে নিষ্কৃতি পাইলে কোনো নির্জ্জন স্থানে গিয়া অবস্থিতি করিব। ... আপনকার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যয় নির্ব্বাহার্থে যাহা প্রেরিত হইয়া থাকে, যতদিন আপনি শরীর ধারণ করিবেন, কোনো কারণে তাহার ব্যতিক্রম ঘটিবেক না।’

তার স্ত্রী দিনময়ী দেবীকে লিখেছিলেন: ‘আমার সাংসারিক সুখভোগের বাসনা পূর্ণ হইয়াছে আর আমার সে বিষেয় অণুমাত্র স্পৃগা নাই। বিশেষতঃ ইদানীং আমার মনের ও শরীরের যেরূপ অবস্থা ঘটিয়াছে ...। এক্ষণে তোমার নিকটে এ জন্মের মত বিদায় লইতেছি ...। তোমার পুত্র উপযুক্ত হইয়াছেন, অতঃপর তিনি তোমাদের রক্ষণাবেক্ষণ করিবেন। তোমাদের নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যয় নির্বাহের যে ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছি, বিবেচনাপূর্ব্বক চলিলে তদ্বারা স্বচ্ছন্দরূপে যাবতীয় আবশ্যক বিষয় সম্পন্ন হইতে পারিবেক।’

অবশেষে কর্মাটাড় বাস। পিতার মৃত্যুর পরেই নারায়ণচন্দ্র কার্মাটাঁড়ের বাড়ি ও সম্পত্তি  বিক্রি করে দেন কলকাতার এক মল্লিক পরিবারের কাছে।  সহজ সরল আদিবাসী মানুষের বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন তিনি। দলে দলে সাঁওতাল বিদ্যাসাগরের কাছে আসতেন ভুট্টা বিক্রি করতে। আর বিদ্যাসাগর সেই ভুট্টা কিনে ঘরে রাখতেন। কাজ শেষে সাঁওতালেরা বিকেলে ঘরে ফেরার পথে খেতে চাইতেন বিদ্যাসাগরের কাছে। ওদের থেকে সকালে কিনে রাখা ভুট্টা খেতে দিতেন বিদ্যাসাগর। সাঁওতালদের সঙ্গে বিদ্যাসাগরও সেই ভুট্টা পুড়িয়ে খেতেন। এলাকার আদিবাসীদের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করে তাদের কাছে জীবনদাতা ঈশ্বর হয়ে উঠেছিলেন তিনি। সেখানে মেথরপল্লিতে উপস্থিত থেকে তিনি নিজের হাতে কলেরা রোগীর শুশ্রূষা করেছেন। বিদ্যাসাগর দেখেছিলেন তাদের সহজ, সরল জীবনযাত্রা। যেখানে ছিল না কোনো দ্বিচারিতা বা কপটতা। প্রতি বছর পুজোর সময়ে তিনি তাদের জন্য জামাকাপড় কিনতেন। শীতে কার্মাটাঁড়ে হাড়-কাঁপানো ঠান্ডা। তখন মোটা চাদর কিনে গরিব মানুষের মধ্যে  বিতরণ করতেন। জীবনের অন্তিম লগ্নে তাকে হয়ত দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল এই কর্মাটাড় যে রেলস্টেশনের নাম এখন বিদ্যাসাগর।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর