অপেক্ষা প্রতিষেধকের

অপেক্ষা প্রতিষেধকের

প্রকাশিত: ১৭:২৭ ১২ এপ্রিল ২০২০  

পরিচিতি ও কাব্যচর্চা দুই বাংলায়। মূলতঃ কবি হলেও উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও পাঠকমহলে জনপ্রিয়। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই কলকাতায়। কর্পোরেটের চাকরি ছেড়ে সাহিত্যজগতে আত্মপ্রকাশ বেশ দেরিতেই। কিন্তু অগ্রগমন দ্রুত। এরইমধ্যে ১০ টি গদ্য ও উপন্যাস এবং ৪ টি কবিতা সংকলন প্রকাশিত তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আলতাফ, হুমায়ূন ও বঙ্গবন্ধুর কলকাতার জীবন অবলম্বনে লেখা উপন্যাস ‘মহানির্মাণ’।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভিড ১৯-কে মহামারী ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সকলেই উদগ্রীব হয়ে উঠেছেন এর ভ্যাকসিন বা টিকা সম্পর্কে। কবে আসছে করোনার টিকা বা প্রতিষেধক?

টিভির ফুটেজ খাওয়া রাজনীতিবিদরা বলছেন এই এসে পড়ল বলে, বড়জোর মাস ছয়েক। সংবাদমাধ্যম নাচতে শুরু করল, ব্রেকিং নিউজ – করোনার টিকা এই আসার মুখে। বিজ্ঞান পাঠ করা বিদ্বজ্জন মনে মনে ভাবল হতেও পারে বা। বিজ্ঞানীরা চোঁয়া ঢেকুর তুলে বলল– সবই সম্ভব। না ভাই, পরিষ্কার বলি যে অসম্ভব এত দ্রুত এই ভ্যাকসিন বাজারে আসা। কাজেই এই টিকার প্রত্যাশা ভুলে যান। কেন এই কথাগুলি বললাম তা এবার সহজে বিবৃত করার চেষ্টা করা যাক।

করোনাভাইরাসেস। সহজ ভাষায় বলতে হলে এক বিশেষ ধরনের ভাইরাসের পরিবার। প্রকৃতিতে এখনো পর্যন্ত মানুষের জানা দু’শরও বেশি এই ধরনের করোনাভাইরাস রয়েছে। যার মধ্যে অবশ্য মাত্র সাতটি করোনাভাইরাসই মানুষের শরীরে সংক্রমণ করতে সক্ষম। সপ্তমটি হল বর্তমানে বিশ্বময় ত্রাসের কারণ। নাম সার্স-কোভ-২ বা ‘কোভিড ১৯’। করোনাভাইরাসেস-এর যে সাতটি মানব শরীরে সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম, তার মধ্যে চারটি ভাইরাস, যথা,  ‘এইচকিউওয়ান’, ‘এনএল-৬৩’, ‘ওসি-৪৩’ এবং ‘২২৯ই’ ভাইরাসকে আপাতভাবে নিরীহ বলা যেতে পারে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষের সাধারণ সর্দি-কাশির কারণ এই চারটি। পঞ্চম ও ষষ্ঠ ভাইরাসগুলি হল যথাক্রমে ‘সার্স-কোভ’ ও ‘মার্স-কোভ’। এই দুই ভাইরাস মানবদেহে শ্বাসকষ্টজনিত অসুখ তৈরি করে। এর পরে আসে ২০১৯ সালে আবিষ্কৃত ‘কোভিড ১৯’।

‘কোভিড ১৯’-এর জিনগত বিন্যাস, গঠন এবং কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে কিছুটা আমরা জানতে পেরেছি। আমরা জানি যে জীবকোষে দু’ধরনের নিউক্লিক অ্যাসিড থাকে। একতন্ত্রী রাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড অর্থাৎ, আরএনএ এবং দ্বি-তন্ত্রী ডি-অক্সি রাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড অর্থাৎ, ডিএনএ। জীবকোষের যাবতীয় কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে এই ডিএনএ এবং আরএনএ। যে সমস্ত কোষ ডিএনএ নিয়ন্ত্রিত, সেখানে ডিএনএ-এর সজ্জাবিন্যাসকে (টেমপ্লেট) বুঝে এম-আরএনএ (mRNA) এবং টি-আরএনএ (tRNA) কোষের অঙ্গাণু রাইবোজোমের সহায়তায় নানা প্রোটিন (নানা ধরনের উৎসেচকও হতে পারে) তৈরি করে।

আরএনএ ভাইরাস হতে পারে দু’রকম। ‘পজিটিভ সেন্স আরএনএ ভাইরাস’ ও ‘নেগেটিভ সেন্স আরএনএ ভাইরাস’।  পজিটিভ সেন্স আরএনএ ভাইরাস ‘হোস্ট’-এর কোষে ঢুকে নিজেই নিজেকে এমআরএনএ (mRNA) হিসাবে ব্যবহার করতে পারে। ‘কোভিড ১৯’ ভাইরাসটি ‘পজিটিভ সেন্স আরএনএ ভাইরাস।  ফলে এরা এরা আক্রান্তের (‘হোস্ট’, এ ক্ষেত্রে মানুষ) শরীরের কোষে ঢুকে সরাসরি নিজেকে ব্যবহার করে নিজের প্রয়োজনীয় এনজাইম তৈরি করে নিতে পারে।  এই উৎপন্ন উৎসেচকের মধ্যে আছে রেপ্লিকেস ১এবি বা ১এবি পলিপ্রোটিন যারা খুব সহজেই আক্রান্তের কোষে দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটাতে পারে। এছাড়া উৎপন্ন আরেকটি উৎসেচক  S বা স্পাইক প্রোটিনের একটি বিশেষ অংশ হুকের মতো মানবকোষের পর্দায় থাকা ‘রিসেপ্টর’-এর সঙ্গে আটকে মানবকোষের পর্দায় ছিদ্র তৈরি করে। তারপর সেখান থেকেই একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় গোটা ভাইরাসটিই মানবকোষের ভিতরে ঢুকে যায়। এই ছিদ্র তৈরি করার ক্ষেত্রে এই ভাইরাস এক অনন্য পদ্ধতি (‘পলি বেসিক ক্লিভেজ’) অবলম্বন করে। সেই কারণে একে ‘নোভেল করোনাভাইরাস’

হৃদরোগী, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবিটিস জনিত কারণে যারা ভোগেন, তাদের ওষুধ খাওয়ার ফলে তাদের শরীরে এই ধরনের রিসেপ্টরের সংখ্যা বেড়ে যায়। যার ফলে, এদের কোভিড ১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যেতে পারে কয়েক গুণ। কোভিড ১৯-এর প্রভাব কেন এত মারাত্মক, আর কেনই বা তার এত দ্রুত বিস্তার? কারণ  বিবর্তন (ইভোলিউশন) এবং পরিব্যক্তি (মিউটেশন)-এর তত্ত্ব  দেখলেই এর উত্তর সহজবোধ্য। এর পুরো জিনোমে ৯৩টি ‘মিউটেশন সাইট’ রয়েছে। এর জিনোমে মিউটেশন ঘটাচ্ছে। যেগুলি এই ভাইরাসের সংক্রমণ করার ক্ষমতাকে সহস্রাধিক গুণ বাড়িয়ে তুলতে পারে। সুতরাং, বোঝা যায়, এই ভাইরাস নিজেকে দ্রুত বিকশিত করতে কতটা সক্ষম এবং এর মিউটেশনের ধরন বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন।

বর্তমানে প্রায় ৩৫টি সংস্থা এবং শিক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান এই ধরনের করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরির সংগ্রামে রত। চারটি টিকার প্রয়োগ এরইমধ্যে বিভিন্ন মনুষ্যেতর প্রাণীর উপর হয়েছে। একটির  ট্রায়াল মানব শরীরে শুরু হয়েছে। সমস্ত ভ্যাকসিন একই নীতি মেনে কাজ করে। জীবাণুর কিছু অংশ বা পুরো জীবাণুকেই সাধারণত ইনজেকশন আকারে কম ডোজে শরীরে ঢোকানো হয় যাতে সেগুলো ব্যবহার করে আমাদের ইমিউনিটি সিস্টেম ওই জীবাণুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে। এই অ্যান্টিবডি তৈরির প্রক্রিয়াটি আমাদের ইমিউনিটি সিস্টেম তার স্মৃতিতে ধরে রাখে, যাতে পরে ওই জীবাণুর সত্যিকারের সংক্রমণ হলে শরীর আবার দ্রুত অনেক অ্যান্টিবডি তৈরি করে নিতে পারে। 

কোভিড ১৯-এর কিছু ভ্যাকসিন প্রকল্প এই প্রথাগত পদ্ধতিগুলি ব্যবহার করছে। আবার অনেকেই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। যে কোনো টিকা বাজারজাত করার অনুমোদন পেতে গেলে হিউম্যান ক্লিনিকাল ট্রায়াল হল একটা অপরিহার্য পূর্বশর্ত। এই ট্রায়াল সাধারণত তিনটি পর্যায়ে ঘটে। প্রথমে অল্পসংখ্যক স্বাস্থ্যবান স্বেচ্ছাসেবকের উপর টিকা প্রয়োগ করে দেখা হয় ভ্যাকসিন তাদের কতটা সুরক্ষা দেয় এবং তাদের উপর ভ্যাকসিনের কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ছে কিনা। দ্বিতীয় ধাপে সাধারণত এই রোগে আক্রান্ত কোনো দেশের কয়েকশো মানুষের উপর প্রয়োগ করে দেখা হয় ভ্যাকসিনটি কতটা কার্যকরী। তৃতীয় ধাপে কয়েক হাজার লোকের ক্ষেত্রেও একইভাবে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা পরখ করা হয়। পরীক্ষামূলক ভাবে কোনো ভ্যাকসিন এই পর্যায়গুলির মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় অনেক স্বেচ্ছাসেবক মাঝপথে পিঠটান দেন, ফলে আরো দেরি হয়। এর অবশ্য যথেষ্ট কারণও রয়েছে। হয় টিকাগুলো নিরাপদ নয় বা সে রকম কার্যকর নয়, বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে দু’টিই সত্যি। এই ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করা অপরিহার্য। এ জন্যই ক্লিনিকাল ট্রায়াল এড়িয়ে বা তাড়াহুড়ো করে বাজারজাত করা নিষেধ।

এই করোনাভাইরাস আগে আরও দুটো মহামারি ঘটিয়েছিল— চিনে শুরু হওয়া সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম বা সার্স এবং সৌদি আরবে শুরু হওয়া মিল ইস্ট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম বা মার্স। উভয়ক্ষেত্রেই ভ্যাকসিনগুলির কাজ শুরু হয়েছিল, কিন্তু পরে তা ঠান্ডাঘরে চলে যায়। মেরিল্যান্ডের নোভাভ্যাক্স নামে একটি সংস্থা এখন সার্স-সিওভি-২-এর জন্য এই ভ্যাকসিনগুলি পুনরায় গুদাম থেকে বের করে হিউম্যান ট্রায়ালের চেষ্টা করছে। অন্য দিকে মডার্না কোম্পানি মেরিল্যান্ডের বেথেসডায় ইউএস ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজের সহযোগিতায় তৈরি মার্স ভ্যাকসিনগুলোর হিউম্যান ট্রায়ালে উদ্যোগী হচ্ছে।

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনগুলোক জেনেটিক উপাদান থেকেই তৈরি এবং এই ধরনের কোনো ভ্যাকসিন আজ অবধি অনুমোদিত হয়নি, তাই একে একেবারে নতুন ভ্যাকসিন হিসাবে বিবেচনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো শর্টকাট রাস্তা নিলে হিতে বিপরীত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। ১৯৬০-এর দশকে শ্বাসযন্ত্রে সংক্রমণ সৃষ্টিকারী সিনসিটিয়াল ভাইরাসের বিরুদ্ধে একটা ভ্যাকসিন তৈরি হয়েছিল। সিনসিটিয়াল ভাইরাস একটা সাধারণ ভাইরাস যা শিশুদের কমন কোল্ডের জন্য দায়ী। ক্লিনিকাল ট্রায়ালগুলিতে দেখা গেল ওই ভ্যাকসিনটি শিশুদের মধ্যে উপসর্গ আরো বাড়িয়ে তুলছে। ফলে ভ্যাকসিনটি বাতিল করা হল। এই সব কারণে একটা ভ্যাকসিনের সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের জন্য সাধারণত এক দশক বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইছেন নভেম্বরে মার্কিন নির্বাচনের আগেই ভ্যাকসিন বাজারে আনতে, যা একটা অবান্তর দাবি, অসম্ভব সময়সীমা। বেশির ভাগ ভ্যাকসিনোলজিস্টের মতে এই টিকাটি আসতে ১২ থেকে ১৮ মাস লাগবে। বেশিও লাগতে পারে। কোভিড ১৯ ভ্যাকসিন অনুমোদিত হয়ে গেলে আরও একটা চ্যালেঞ্জ সামনে আসবে, তা হল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক। ক্ষমতাধর ও বিত্তশালী দেশগুলো তাদের নাগরিকদের জন্য আগেভাগেই ভ্যাকসিনের সত্ত্ব কিনে নিতে চাইবে, বঞ্চিত হবে তৃতীয় বিশ্ব। কাজেই আমাদের উচিৎ মহামারী নিয়ন্ত্রণে আমাদের অবশ্যপালনীয় কর্তব্যগুলো পালন করে যাওয়া— কাফ এটিকেট, হাত ধোয়া এবং সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং।

কাজেই মনে বড় আশা করে লাভ নেই। কমিউনিটি সংক্রমণ শুরু না হলেও আমাদের দুই দেশেই ক্লাস্টার সংক্রমণ শুরু হয়ে গেছে। লক ডাউন করে আক্রমণের তীব্রতা ও সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে। এটাই সঠিক পদ্ধতি। ক্রমে এই ভাইরাস ধীরে ধীরে কমিউনিটি এক্সপোজার পর্বের মধ্যে দিয়ে যাবে। তাতে বেশ কিছু মানুষ মারা যাবেন, তবে বেশি মানুষের মধ্যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে যাবে। করোনার বিষদাঁত তখন ভেঙে যাবে। পৃথিবী আবার শান্ত হবে। এগিয়ে চলবে মানব সভ্যতা।  

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর