Alexa অপচয় থেকে বাঁচার উপায় (পর্ব-১)

অপচয় থেকে বাঁচার উপায় (পর্ব-১)

মাওলানা ওমর ফারুক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:৪০ ১৬ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ১৭:৪২ ১৬ জুলাই ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

অপচয় কৃপণতার বিপরীত জিনিস। কৃপণতার অর্থ হলো, যেখানে খরচ করা উচিত সেখানে খরচ না করা। আর অপচয়ের অর্থ হলো, যেখানে খরচ না করা উচিত সেখানে খরচ করা। এ উভয়টি নাজায়েজ ও নিষিদ্ধ। 

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় বান্দাদের গুণ ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে ইরশাদ করেন,

و الذين إذا أنفقوا لم يسرفوا و لم يقتروا و كان بين ذلك قواما

‘দয়াময়ের বান্দারা যখন খরচ করে, তখন অপচয়ও করে না কৃপণতাও করে না। আর এদুয়ের মাঝেই হলো মধ্যমপন্থা।’ (সূরা: ফুরকান, আয়াত: ৬৭)।

আরো পড়ুন>>> হজে বিশ্বনবী (সা.) এর পঠিত তালবিয়া ও দোয়া

তাই মানুষের অপচয়ও করা উচিত না এবং কৃপণতাও করা উচিত না।

ব্যয় করার পূর্বে চিন্তা করো:  অপচয় সম্পর্কিত আলোচনায় সর্বপ্রথম হজরত থানবি (রহ.) এর একটি মালফুজ উদ্ধৃত করেছেন। মালফুজটি হজরত থানবি (রহ.) তার এক মুরিদের পত্রের উত্তরে তারবিয়াতুস সালিক কিতাবে লিখেছেন। মালফুজটি এই, ব্যয় করার পূর্বে গুরুত্বের সঙ্গে দুটো কাজ করবে। একটি এই যে, ব্যয় করার পূর্বে চিন্তা করবে যে, এ ক্ষেত্রে যদি ব্যয় না করি, তা হলে কোনো ক্ষতি হবে কী না। যদি ক্ষতি না হয় তা হলে সে ক্ষেত্রে ব্যয় করবে না। আর যদি ক্ষতি হবে বলে মনে হয়, তা হলে কোনো মুরুব্বির সঙ্গে পরামর্শ করবে যে, এ ক্ষেত্রে ব্যয় করাটা অসমীচীন নয় তো? তিনি যা বলবেন সে অনুযায়ী কাজ করবে। ক্ষতি দ্বারা বাস্তবিক ও প্রকৃত ক্ষতি উদ্দেশ্য। যার মাপকাঠি হলো শরিয়ত। কাল্পনিক ক্ষতি উদ্দেশ্য নয়।

রোগী অনুযায়ী চিকিৎসা: এ মালফুজে হজরত থানবি (রহ.) অপচয় থেকে বাঁচার উপায় লিখেছেন। চিকিৎসক তার চিকিৎসাধীন রোগীর পর্যবেক্ষণ করে তার অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থাপত্র দিয়ে থাকেন। সুতরাং এ মালফুজের মাধ্যেও হজরত তাকে বলেছেন যে, যদিও কোথাও খরচ না করাতে ক্ষতি হবে বলে মনে হয়, সেখানে কোনো মুরুব্বির সঙ্গে পরামর্শ করবে। এমন মনে হচ্ছে যে, যাকে লক্ষ্য করে এ কথা বলেছেন, সে হয়তো খুব বেশি অপচয় করত এবং তার মতামতের ওপর নির্ভর করা যাচ্ছিল না। এ কারণে তিনি এ ব্যবস্থা নির্ধারণ করেছেন।

এমতাবস্থায় ব্যয় করবে না: অন্যথায় আসল কথা হলো, মানুষ ব্যয় করার পূর্বে চিন্তা করবে যে, যদি ব্যয় না করি তা হলে কী ক্ষতি হবে? ব্যয় না করায় যদি কোনো ক্ষতি থাকে তা হলে ব্যয় করবে। কিন্তু ব্যয় না করায় যদি কোনো ক্ষতি না থাকে তা হলে ব্যয় করার প্রয়োজনটা কী? সে ব্যয় প্রয়োজনের অতিরিক্ত হবে।

ক্ষতির সিদ্ধান্ত কে দেবে? এখন প্রশ্ন হলো, কোথায় খরচ না করায় ক্ষতি আছে, আর কোথায় ক্ষতি নেই? এটি এমন একটি প্রশ্ন যার দুই আর দুই চারের মত এক কথায় উত্তর দেয়া মুশকিল। যেকোনো শাস্ত্রে এবং বিদ্যায় যে সমস্ত নিয়ম-নীতি থাকে, তা একটি পর্যায় পর্যন্ত কাজ দেয়। সেই পর্যায় অতিক্রম করলে সেখানে মানুষকে নিজের সুস্থ রুচির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

ব্যয় করার মধ্যে উপকার আছে কী না? এটি তো হলো নেতিবাচক দিক যে, ব্যয় করার পূর্বে দেখে নাও, ব্যয় না করলে ক্ষতি আছে কী না। এর বিপরীতে একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। তা এই যে, ব্যয় করার সময় দেখ, ব্যয় করার মধ্যে কোনো উপকার আছে কী না। ব্যয় করার মধ্যে যদি উপকার থাকে তা হলে ব্যয় করো, আর যদি উপকার না থাকে তা হলে ব্যয় করো না। এটাই হলো আসল মাপকাঠি। তাই অপচয়ের আসল অর্থ হলো-‘এমন ব্যয় যার কোনো উপকার নেই’। উপকার এখানে ব্যাপক অর্থবোধক। তা দীনের উপকার হোক বা দুনিয়ার উপকার হোক। দুনিয়ার উপকার বলতে শরিয়তসম্মত এবং জায়েজ উপকার উদ্দেশ্য। নাজায়েজ উপকার উদ্দেশ্য নয়। তাই যে ব্যয়ের মধ্যে দীনের উপকার রয়েছে বা দুনিয়ার জায়েজ এবং শরিয়তসম্মত উপকার রয়েছে, তা অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়। আর যদি ব্যয়টি এমন হয়, যার আদৌ কোনো উপকার নেই বা এমন উপকার রয়েছে, যা লাভ করা শরিয়তে জায়েজ নেই, এমন ব্যয় অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত।

এটি অপচয় নয়: উপর্যুক্ত বিস্তারিত আলোচনার দ্বারা এ মূলনীতি বের হয়ে আসে যে, এমন অনেক খরচ রয়েছে, যেগুলোকে মানুষ অপচয় মনে করে, অথচ বাস্তবে তা অপচয় নয়। যেমন, একজন মানুষ তার শক্তি সামর্থ্যরে মধ্যে থেকে নিজের আরামের জন্য বা নিজের মনকে খুশি করার জন্য অন্য লোকদের তুলনায় বেশি টাকা ব্যয় করে কোনো জিনিস ক্রয় করে আনল। যেমন, একটি জিনিস বাজারে দশ টাকাতেও পাওয়া যায়, পনের টাকাতেও পাওয়া যায় এবং বিশ টাকাতেও পাওয়া যায়। আবার ওই জিনিসই একশ টাকাতেও পাওয়া যায়। তবে এগুলোর মাঝে গুণগত মানের পার্থক্য রয়েছে। এখন একজন মানুষের ওই জিনিসই ক্রয় করার জন্য একশ টাকা ব্যয় করার সামর্থ্য আছে এবং তা ক্রয় করার জন্য তার অন্য কারো থেকে ঋণ নেয়ারও প্রয়োজন নেই। তাই সে ব্যক্তি নিজের আরাম ও সুবিধার জন্য দশ টাকার জিনিসের পরিবর্তে একশ টাকার জিনিস ক্রয় করল, তা হলে এটি অপচয় বা গুনাহ নয়।

সফরের জন্য সুবিধাজনক বাহন গ্রহণ করা: তদ্রুপ তোমাকে সফর করে অন্য শহরে যেতে হবে। এখন তুমি তার জন্য রেলগাড়ির তৃতীয় শ্রেণীতেও ভ্রমণ করতে পার, দ্বিতীয় শ্রেণীতেও ভ্রমণ করতে পার, প্রথম শ্রেণীতেও ভ্রমণ করতে পার, এয়ার কন্ডিশনেও ভ্রমণ করতে পার এবং বিমানেও ভ্রমণ করতে পার। এগুলোর ভাড়ার মধ্যেও তারতম্য রয়েছে। কিন্তু যার এয়ার কন্ডিশনে ভ্রমণ করার সামর্থ্য রয়েছে, সে বলল যে, আমি তো আমার আরামের জন্য এয়ার কন্ডিশন ক্লাসে ভ্রমণ করবো, তা হলে এটা অপচয় হবে না এবং গুনাহও হবে না। এমনিভাবে কেউ নিজের মনকে খুশি করার জন্য বা নিজের স্ত্রী সন্তানকে খুশি করার জন্য ব্যয় করল, তা হলে তা অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত হবে না।

তিন স্তরের বাসস্থান জায়েয: হজরত থানবি (রহ.) বাড়ির ব্যাপারে একটি মূলনীতি বলেছেন, যা সব জিনিসের ব্যাপারে ফিট হয়। হজরত বলেন যে, বাড়ি বিভিন্ন স্তরের হয়ে থাকে। এক হলো বসবাসের যোগ্য। অর্থাৎ, আপনি স্বল্প পরিসরে কাঁচা একটি বাড়ি বানান বা শুধু ইট পাথর দিয়ে একটি বাড়ি বানান, তার উপর টিনের ছাউনি দিন, এবার এতে বসবাস করুন। তাতে না প্লাস্টার থাকবে, না চুন-পেইন্ট থাকবে। এটি হলো বসবাসের বাড়ির প্রথম স্তর।

বসবাসের বাড়ির দ্বিতীয় স্তর হলো ‘আরামদায়ক বসবাস’ উপযোগী বাড়ি। যেমন, একটি বাড়ি করলেন। তার ছাদ পাকা করলেন। শোয়ার জন্য খাটের ওপর গদি বিছালেন যাতে আরামে ও শান্তিতে ঘুমাতে পারেন। এসব হলো আরামের ব্যবস্থা। এটা জায়েজ। এটা হলো বসবাসের দ্বিতীয় স্তর।

আর তৃতীয় স্তর হলো বাড়িতে সাজ-সজ্জা করা। যেমন, পাকা বাড়ি বানালেন। তার সাজ-সজ্জা ও সৌন্দর্যের জন্য তাতে প্লাস্টার করালেন, রং করালেন। বাথরুমে টাইলসও লাগালেন। এ সবই সাজ-সজ্জার অন্তর্ভুক্ত। যদি হালাল মাল দ্বারা এ সব কাজ করিয়ে থাকেন এবং এর জন্য কারো থেকে ঋণ নিতে না হয়ে থাকে, তা হলে এটিও জায়েজ আছে। বসবাসের ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে এ তিনটি স্তরই জায়েজ আছে। অর্থাৎ, বসবাসের ব্যবস্থা করা জায়েজ, তাতে আরামের ব্যবস্থা করা জায়েজ এবং সাজ-সজ্জা করাও জায়েজ।

চতুর্থ স্তর জায়েজ নয়: চতুর্থ স্তর হলো ‘প্রদর্শনী’। অর্থাৎ, লোক দেখানো। কোনো কাজ শুধু এ জন্য করা যে, লোকে বুঝবে সে অনেক বড় মানুষ। অনেক বড়লোক। মানুষ বলবে যে, তার বাড়ি অতি শানদার। এর অর্থ এই যে, এসব জিনিস সে নিজের সম্পদের প্রদর্শনীর জন্য করেছে। এ স্তরটি হারাম। এ প্রদর্শনীর মধ্যে উপকার তো রয়েছে, কারণ যখন সে নিজের সম্পদের প্রদর্শনী করবে, তখন মানুষ তাকে বড়লোক মনে করবে। তখন মানুষ তার সম্মান করবে। তার হুকুম মানবে। তো এ প্রদর্শনীর মধ্যে উপকার তো আছে, কিন্তু তা শরিয়ত সম্মত নয়। শরিয়তে এ উপকার গ্রহণযোগ্য নয়। তাই এটি অপচয়ের শামিল।

আসল মাপকাঠি শরিয়তসম্মত উপকারিতা: লক্ষ্য করুন, বসবাস করা একটি উপকার, আরাম আয়েশের ব্যবস্থা করা একটি উপকার এবং সাজ-সজ্জাও একটি উপকার। এ তিন উদ্দেশ্যে যা কিছু খরচ করা হচ্ছে তা অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়। আর প্রদর্শনীর মধ্যে উপকার তো আছে কিন্তু তা শরিয়তসম্মত নয়। তাই তা অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত। বিধায় এমন কাজ, যার মধ্যে কোনো উপকার নেই। যেমন, টাকা তুলে ফেলে দিল বা একটি জিনিস অধিক মূল্যে ক্রয় করল। অথচ সামান্য সতর্কতার সঙ্গে ক্রয় করলে তা সস্তায় পেত। কিন্তু সে ওই জিনিসই ক্রয়ের ক্ষেত্রে নিজের উদাসীনতা, অবহেলা ও অবমূল্যায়নের কারণে অধিক টাকা ব্যয় করল। এটা অপচয় হলো। চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

Best Electronics
Best Electronics