Alexa অধ্যক্ষ সিরাজের ভয়ংকর বর্ণনায় নুসরাত হত্যা

অধ্যক্ষ সিরাজের ভয়ংকর বর্ণনায় নুসরাত হত্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১২:৩২ ২৪ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১৬:০৪ ২৪ অক্টোবর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বহুল আলোচিত ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায় বৃহস্পতিবার ঘোষণা করা হয়েছে। এর আগে আদালতে এই মামলার প্রধান আসামি সিরাজ উদদৌলা’র জবানবন্দিতে বেরিয়ে এসেছিল নুসরাত হত্যার ভয়ংকর তথ্য।

এই রায়ে প্রধান আসামি সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ জনকে ফাঁসিতে  ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্দেশ দিয়েছে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে। 

এর আগে গত ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নুসরাত মারা যান।

রায় ঘোষণার আগে এই মামলায় খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি তুলেছিল নুসরাতের পরিবার। মামলার রায়কে ঘিরে ফেনীর আদালত চত্বরে ছিল কঠোর নিরাপত্তা। একই সঙ্গে নুসরাতের বাড়িতেও অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। 

অধ্যক্ষ সিরাজের আদালতে দেয়া জবানবন্দি তুলে ধরা হলো:

সিরাজ আদালতে জবানবন্দিতে  বলেন, আমি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিলিয়া মাদরাসায় ২০০০ সালে উপাধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করি। পরে ২০০১ সালে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করি। সেই থেকে দীর্ঘ ১৯ বছর দায়িত্ব পালন করি। মাদরাসায় দায়িত্ব পালন করার লক্ষ্যে আমি আমার প্রভাব বিস্তার করার জন্য স্থানীয় ক্ষমতাসীন নেতা, প্রভাবশালী ব্যক্তি, থানা ও প্রশাসনের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলি। ছাত্র ও ছাত্রীদের মধ্যে আমার প্রভাববলয় তৈরি করি। এভাবে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক হয়। তাদের নিয়ে আমি মাদরাসার যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতাম ও তা বাস্তবায়ন করতাম।

এভাবে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বৃদ্ধি পায়  আমার। মাদরাসার ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে আমি কিছু ছাত্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক করি। এদের মধ্যে ছিলেন ছাত্রদলের সভাপতি নূর উদ্দিনসহ হাফেজ আবদুল কাদের। এছাড়া জাবেদ, জুবায়ের, এমরান, রানা, শামীম, শরীফদের আমি বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা করতাম। তাদের পরীক্ষার ফি, বেতন মওকুফ করে দিতাম। তাদের পরীক্ষায় বিশেষ সুবিধা দেয়া ও তাদের পছন্দের ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি করে সেখান থেকে তাদের কমিশন দিতাম।

তিনি আরো বলেন, শাহাদাত হোসেন শামীম ও নূর উদ্দিন আমার খুবই ঘনিষ্ঠ ছাত্র। তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত বিষয়েও আলাপ-আলোচনা করতাম। মাদরাসার সিদ্ধান্তগ্রহণ সংক্রান্ত যেকোনো বিষয় তাদের বললে করে দিত। তারা পরীক্ষার সময় ছাত্রছাত্রী ভর্তি থেকে শুরু করে পরীক্ষার ফিস রেজিস্ট্রেশন ও ফরম পূরণসহ কাজের ভালো ভাগ পেত। তারা শুধু সরকারি ফি জমা করে বাকি টাকা ভাগ করে নিত। এছাড়া কয়েকজন ছাত্রীর সঙ্গেও আমার ভালো সম্পর্ক হয়। কামরুন নাহার মনিকে আমি চেষ্টা করে বিবাহ দেই ও সহযোগিতা করি। আমার তার সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক হয়। গত তিন মাস আগে আমার অপর ছাত্রী (নুসরাতের সহপাঠী) আমার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করেছিল। আমি তা রুহুল আমিন ভাই ও মাকসুদের মাধ্যমে তার বাবাকে ডেকে সমাধান করি। 

নুসরাতের প্রসঙ্গ টেনে জবানবন্দিতে সিরাজ বলেন, গত ২৭ মার্চ সকালে আমি মাদরাসার পিয়ন নুরুল আমিনের মাধ্যমে নুসরাতকে ডেকে আনি। আমি শুধু তাকে একা কক্ষে ঢুকতে দেই। বাকি তিনজন ছাত্রী রুমের বাইরে ছিল। আমার কক্ষে আসার পরে কিছু কথা হয়। এরপর নুসরাত পড়ে যায়। আমি পেছন থেকে তার কোমরে দুই হাত দেই। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি। সে সেখানে বসে থাকে। এরপর নুরুল আমিনকে ডাকি। নুসরাত তার বান্ধবীর সঙ্গে চলে যায়। তারপর দুপুরে নুসরাতের মা, ছোট ভাই, কমিশনার ইয়াসিন ও মামুনসহ আরো কয়েকজন আসে।

সিরাজ আরো বলেন, নুসরাতের মা আমাকে মারার চেষ্টা করেন। আমি একপর্যায়ে তাদের হুমকি দেই। সেখানে নূর উদ্দিন উপস্থিত ছিল। পরে শাহাদাত ও শামীম আসে। আমি অবস্থা বেগতিক দেখে রুহুল আমিন ভাইকে ফোন করি। রুহুল আমিন থানা থেকে এসআই ইকবালকে পাঠায়। এরপর এসআই ইকবাল নুসরাত জাহান রাফিকে ডেকে আনার জন্য বলে। রাফি এলে এসআই ইকবাল তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তারপর আমাকেসহ থানায় নিয়ে যায়। সেখানে পরে মামলা রেকর্ড করে। আমাকে গ্রেফতার করা হয়।

২৮ মার্চ আমার অনুরোধে ও কাউন্সিলর মাকসুদ এবং রুহুল আমিনের এর তত্ত্বাবধানে মানববন্ধন করা হয়। মাদরাসার ছাত্রছাত্রীদের নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, আবদুল কাদেরসহ অন্যরা জোর করে নিয়ে আসে। আমাকে ওই দিন আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়।

২৯ মার্চ আমার স্ত্রী ফেরদৌস আরা, ছেলে আদনান প্রথম জেলখানায় দেখা করে। তাদের সঙ্গে কথা হয়। তারপর আমার স্ত্রী, শাশুড়ি, তিন বোন দেখা করে। এছাড়া জেলখানায় ছাত্রদের মধ্যে আমার ভক্ত একটি গ্রুপ দেখা করে। তাদের মধ্যে শাহাদাত হোসেন শামীম, নূর উদ্দিন, জাবেদ, রানা ও হাফেজ আবদুল কাদের ছিল। তাদের সঙ্গে মামলা ও জামিন নিয়ে কথা হয়।

এছাড়া নুসরাত জাহান রাফিদের পরিবারকে আপস করতে বাধ্য করা ও মামলা প্রত্যাহার করার জন্য কী করছে, তা আলাপ করি। তাদের মানববন্ধন ও আমার মুক্তির জন্য আন্দোলন করতে বলি। তাদের আমি বকাবকি করি। তাদের দ্রুত চিন্তাভাবনা করে আমাকে জানাতে বলি। এছাড়া রুহুল আমিন ভাই ও মাকসুদ কাউন্সিলরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখার জন্য বলি।

জবানবন্দিতে সিরাজ বলেন, মাদরাসার শিক্ষকদের মধ্যে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ (মাওলানা মোহাম্মদ হোসেন), আরবি প্রভাষক মাওলানা আবুল কাশেম, সহকারী শিক্ষক বেলায়েত হোসেন, সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন ওরফে সেলিম, সহকারী শিক্ষক হাসান আহম্মদ, অফিস সহকারী সিরাজুল হক দেখা করে। তাদের সঙ্গে মাদরাসার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলি।

গত ৩ এপ্রিল আবার শাহাদাত হোসেন শামীম, নুর উদ্দিন, আবদুল কাদের, হাফেজ, জাবেদ, এমরান, রানাসহ কয়েকজন আমার সঙ্গে দেখা করে। ওই সময় জেলখানায় একজন জেলপ্রহরী কিছু দূরে দাঁড়ানো ছিল। আমি তার নাম জানি না। আমরা কিছুক্ষণ কথা বলি।

তাদের আমার জামিন, মানববন্ধন ও আন্দোলন নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করি। তারা জানায়, জামিন এত তাড়াতাড়ি হবে না। পরে নুসরাত জাহান রাফি ও তার পরিবারের বিষয়ে তারা কী করল, তা জানার চেষ্টা করি। এভাবে কিছুক্ষণ কথা বলার পর আমি প্রকাশ্যে শাহাদাত হোসেন শামীম ও নূর উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলি। সে সময় অন্যরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।

তাদেরকে জানাই যে সর্বশক্তি দিয়ে বিষয়টি দেখতে। নুসরাত জাহান রাফির পরিবার ও নুসরাতকে ভালোভাবে চাপ দিতে। যদি এতে কাজ না হয়, তাহলে ভালোভাবে পরিকল্পনা করে নুসরাত জাহান রাফিকে হত্যা করার জন্য। বিশেষ কায়দায় তাকে হত্যা করতে যেন তা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়া যায়। যদি তারা ভালো মনে করে প্রয়োজনে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করার জন্য বলি।

অধ্যক্ষ আরো বলেন, তাদেরকে আরো বলি যে, এই বিষয়ে রুহুল আমিন ভাই ও মাকসুদ কাউন্সিলর তাদের যেকোনো সহযোগিতা করবে। টাকা-পয়সার প্রয়োজন হলে তাদের মাধ্যমে পাওয়া যাবে। এছাড়া থানা ও প্রশাসন তারা ম্যানেজ করবে। খুব ভালোভাবে যাতে পরিকল্পনা করে। এরপরে শাহাদাত হোসেন শামীম ও নূর উদ্দিন আমার কথার সঙ্গে একমত প্রকাশ করে। এরপর তারা চলে যায়।

সিরাজ আরো বলেন, এরপরে কীভাবে এ হত্যাকাণ্ড করে, তার বিস্তারিত জানতে পারিনি। আমি ভুল করেছি। তাদের এভাবে হুকুম দেয়া ঠিক হয়নি। আমি অনুতপ্ত।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডআর/টিআরএইচ/টিএএস